পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নজরদারি কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি-র বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কর্পোরেট সুশাসন সংকট এবং তথ্য প্রকাশে গাফিলতির অভিযোগ এনে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা আরও ৯০ কর্মদিবস বাড়ানো হয়েছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি গত ১৬ আগস্ট এক আদেশে তদন্ত কমিটির সদস্য পরিবর্তন করে। সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মিনহাজ বিন সালিমের পরিবর্তে সহকারী পরিচালক মো. হাসানকে কমিটির সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই আদেশ জারি করেছে বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন। কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুন থেকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৯০ কর্মদিবস বাড়ানো হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ২৫ মার্চে জারি করা মূল তদন্ত আদেশের অন্যান্য সব শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।
কিন্তু কেন এই তদন্ত? ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরে রবি আজিয়াটার আর্থিক হিসাব, সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেন, কর্পোরেট সুশাসন অনুশীলন এবং তথ্য প্রকাশের নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তদন্ত কমিটিকে। আদেশ পাওয়ার ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে, আর এখন নতুন করে সময় বাড়ানো হয়েছে।
এই তদন্তের মধ্যেই রবি আজিয়াটা কিন্তু তাদের ব্যবসায়িক অগ্রগতির কথা বলেছে। সম্প্রতি ‘পুঁজিবাজারে পাঁচ বছর: সুশাসনে উৎকর্ষতাই কর্মক্ষমতা’ শীর্ষক এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তারা জানায়, ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে অভিষেকের পর থেকে গত পাঁচ বছরে তারা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ৯ হাজার ৩৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ তাদের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করেছে এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি এনেছে।
এই বিনিয়োগের ফলও কিন্তু হাতে-নাতে পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তালিকাভুক্তির পর থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। ২০২০ সালের শেষ দিকে আইপিওর মাধ্যমে রবি ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিল। প্রথম বছর তারা লভ্যাংশ না দিলেও পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে কোম্পানিটি।
সবচেয়ে বড় খবর হলো, ২০২৫ সালে রবি আজিয়াটা ৯৩৭ কোটি টাকা নেট মুনাফা করেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে এটি তাদের প্রথম বার্ষিক মুনাফা। আগের বছরের তুলনায় এই মুনাফা বেড়েছে ৩৩.৩ শতাংশ। মুনাফা বাড়ার সুবাদে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ১৭.৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ৭৫ পয়সা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ২০২০ সালে তালিকাভুক্তির পর থেকে এটি তাদের সর্বোচ্চ লভ্যাংশ। প্রস্তাবিত এই লভ্যাংশ কোম্পানির মোট মুনাফার ৯৭.৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে রবি ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল।
তবে এই সাফল্যের গল্পের মাঝেই বিএসইসির তদন্ত কমিটি পুনর্গঠনের খবর এসেছে। কেন এই সময়ে কমিটি পুনর্গঠন? কেন সময় বাড়ানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তদন্ত শেষেই পাওয়া যাবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা রবি আজিয়াটার কার্যক্রম নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট নয়। অন্যদিকে রবি আজিয়াটা তাদের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়ে বলছে, তারা সবকিছু নিয়ম মেনেই করছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে রবি আজিয়াটার মতো বড় একটি কোম্পানি, যার হাতে রয়েছে দেশের মোট মোবাইল গ্রাহকের একটি বড় অংশ, সেখানে এই তদন্তের প্রভাব পড়তে পারে শেয়ারবাজারেও। বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন তদন্তের ফল কী হতে পারে? কোনো বড় অনিয়ম ধরা পড়লে কি রবির শেয়ারের ওপর প্রভাব পড়বে? নাকি সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হবে?
বিএসইসি অবশ্য জানিয়েছে, মূল তদন্তের শর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ, তদন্তের আওতা বা বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু কমিটির একজন সদস্য পরিবর্তন করা হয়েছে এবং সময় বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব, সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেন, কর্পোরেট সুশাসন ও তথ্য প্রকাশের নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, এই ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটি কী প্রতিবেদন জমা দেয়। আর সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসি কী সিদ্ধান্ত নেয়। রবি আজিয়াটা যেমন তাদের সাফল্যের গল্প বলছে, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তাদের দায়িত্ব পালন করছে। পুঁজিবাজারের স্বার্থে স্বচ্ছতাই সবচেয়ে বড় কথা এই সত্যটি হয়তো দুই পক্ষই মানে।

