গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার পুঁজিবাজারেও। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে প্রবল বিক্রির চাপে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯৭ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৭৮৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ব্লু-চিপ সূচক ডিএস-৩০ও একই পথে হেঁটেছে, ৩০ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে সপ্তাহ শেষে। শুধু সূচকই নয়, বাজার মূলধনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা কমে ৭ লাখ ৩ হাজার ৮১২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণেও এসেছে ধস। সাপ্তাহিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের ৯৯৭ কোটি টাকা থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৯০৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৫২৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪৫৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা কম।
কী কারণে এই পতন? বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে মূলত জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে। ইবিএল সিকিউরিটিজের সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনা বলছে, ‘অমীমাংসিত গ্যাস সংকট ভবিষ্যতের করপোরেট আয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মজুত কমাতে বাধ্য করেছে’। শেলটেক ব্রোকারেজও একই সুরে বলেছে, জ্বালানি সংকটই বাজারের মনোভাবকে প্রভাবিত করার প্রধান কারণ। টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, স্টিল—উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো যখন গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না, তখন তাদের আয় কমে যাওয়া অনিবার্য। বিনিয়োগকারীরা তাই আগেভাগেই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মার্জিন ঋণের নিয়ম নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। সপ্তাহজুড়ে বিনিয়োগকারীরা সংশোধিত মার্জিন নিয়মের চূড়ান্ত রূপ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মাঝামাঝি সময়ে নিয়ম নিয়ে স্পষ্টীকরণ এলেও, কঠোর প্রয়োগমূলক ব্যবস্থার গুঞ্জনে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কঠোর ব্যবস্থার গুজব অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে, তবু ‘নজরদারির ভূত’ বাজারকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
খাতভিত্তিক চিত্রও আশাবাদী নয়। টেক্সটাইল খাত সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে, সপ্তাহের মোট লেনদেনের ২১ দশমিক ২ শতাংশ। তারপরেই রয়েছে সাধারণ বীমা (১৭.৯ শতাংশ) ও প্রকৌশল খাত (৯.৬ শতাংশ)। তবে প্রায় সব খাতেই দরপতন। পাট খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। কাগজ ও মুদ্রণ খাত কমেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। একমাত্র সেবা ও আবাসন খাতই সামান্য ০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
শেয়ারের দামের বিচারে এনভয় টেক্সটাইল সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করেছে, ২২ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ডমিনেজ স্টিল কমেছে ২১ দশমিক ১ শতাংশ, এমএল ডাইং ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র। সিএসসিএক্স সূচক ২ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৯ হাজার ৪৩০ এবং ক্যাস্পি সূচক ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ কমে ১৫ হাজার ৪৯১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকট যতদিন থাকবে, পুঁজিবাজারের এই অস্থিরতা ততদিন থেকেই যাবে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কোম্পানির মুনাফা কমবে, আর মুনাফা কমলে শেয়ারের দর পড়বে; এই সরল সমীকরণটাই এখন বাজারকে নিচের দিকে টেনে আনছে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছেন, কবে গ্যাসের চাপ ফিরে আসে, কবে কারখানাগুলো পুরোদমে উৎপাদনে ফেরে। ততদিন পর্যন্ত এই পতনের ধারা চলতেই পারে।

