শেয়ারবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার না করেও এখন থেকে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই মর্মে একটি নতুন খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, যা মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় অনুমোদিত হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এই খসড়া নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে খুব শিগগির খসড়াটি সংস্থার ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে, যাতে আগ্রহী পক্ষরা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে চাইলে তার বিদ্যমান মালিক বা শেয়ারধারীদের নূন্যতম ১০ থেকে ২০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছেড়ে দিতে হবে। এই শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি শেয়ারবাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
কারা এই সুযোগ পাবে, তারও একটি স্পষ্ট তালিকা তৈরি করা হয়েছে খসড়ায়। প্রথমত, সরকারের শতভাগ মালিকানাধীন কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের হাতে থাকে, সেগুলো এই সুবিধার আওতায় আসবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি খাতের বাইরেও সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন থেকে সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে, যা আগে সম্ভব ছিল না।
এ ছাড়া ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি মূলধনের টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান এই সুযোগের আওতায় পড়বে। একইভাবে অন্তত তিন বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা ব্যাংক, বিমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও যোগ্য বলে গণ্য হবে। যেসব কোম্পানির সম্পদ বা লেনদেনের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি, সেগুলোও আইপিও ছাড়াই সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য বিবেচিত হবে। সবশেষে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, কেন্দ্রীয় ডিপজিটরি প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় কাউন্টার পার্টি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশি ও বিদেশি ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারমুখী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এত দিন কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানই এই সুবিধা পেত, বেসরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য এই পথ খোলা ছিল না। যদিও স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তি–সংক্রান্ত মূল আইনে সব শ্রেণির কোম্পানির জন্যই এই বিধান ছিল, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আগের নির্দেশনার কারণে তা বেসরকারি খাতে কার্যকর হয়নি। এখন সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নিয়ে সবার জন্য এই সুযোগ উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, মূল আইনে যখন এই সুযোগ আগে থেকেই ছিল, তাহলে নতুন বিধিমালা তৈরির প্রয়োজন কেন পড়ল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এত বড় একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সব পক্ষের মতামত নেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই নতুন করে খসড়া প্রস্তুত করে জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় যাওয়া হচ্ছে।
সরাসরি তালিকাভুক্তি বলতে মূলত বোঝায় এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কোনো কোম্পানিকে আইপিওর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। এই ব্যবস্থায় তালিকাভুক্তির আগে যাঁদের হাতে কোম্পানির শেয়ার থাকে, তাঁরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে নিজেদের শেয়ারের পুরোটা বা একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি বাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন। আইপিওর মতো এখানে শেয়ারের দাম প্রথম থেকেই নির্দিষ্ট ফেসভ্যালুতে বাঁধা থাকে না। বরং কোম্পানির প্রকৃত সম্পদ মূল্যায়ন করে একটি ভিত্তিমূল্য ঠিক করা হয়, তারপর বাজারের চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে প্রকৃত দাম নির্ধারিত হয়।
এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেয়ার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি কোম্পানির তহবিলে যুক্ত হয় না, বরং তা যায় শেয়ার বিক্রয়কারী মালিকদের হাতে। অর্থাৎ প্রচলিত আইপিওতে যেমন কোম্পানি নতুন মূলধন সংগ্রহ করে, সরাসরি তালিকাভুক্তিতে তেমনটি ঘটে না। তবে এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় সাশ্রয়— আইপিওর তুলনায় অনেক কম সময়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। পাশাপাশি বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারিত হওয়ায় ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর জন্য এটি অপেক্ষাকৃত লাভজনক ও আকর্ষণীয় একটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে ভালো মানের দেশি-বিদেশি কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে নতুন এই ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

