পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শনের পরিবর্তে এবার চালু করা হচ্ছে অঘোষিত বা ‘স্পট ইন্সপেকশন’। সম্প্রতি বিএসইসি একটি আট সদস্যের স্থায়ী যৌথ পরিদর্শন প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্যানেলে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) দুইজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।
গত সোমবার ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত ‘দ্য কারেন্ট স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, ব্রোকারদের নজরদারি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কোনো কোনো ব্রোকারের নিয়ন্ত্রকগত সমস্যা রয়েছে, আবার কারও কনসলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) ঘাটতি রয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে জমে আছে। তিনি বলেন, ‘অনিয়ম ধরা পড়লে কমিশন জরিমানা করে, যা স্বাভাবিক ব্যবস্থা। কিন্তু বড় ঘাটতি হলে শুধু জরিমানাই যথেষ্ট নয়। জরিমানা সার্টিফিকেট মামলার দিকে নিয়ে যায়, যা দীর্ঘদিন চলতে পারে’।
ঠিক এই কারণেই ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি ও আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর জোর দিচ্ছে বিএসইসি। চেয়ারম্যানের ভাষায়, ‘অনেক সময় সিসিএ ঘাটতি ধরা পড়ার পর টাকা ফেরত দেওয়া হয়, আবার পরে তা তুলে নেওয়া হয়’। কমিশন ও ডিএসই নিয়মিতভাবে এই পরিদর্শন চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, প্রয়োজনে স্পট ইন্সপেকশন করা হবে, তবে এটি নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ নয়। এতে আতঙ্কের কিছু নেই; বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য।
পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত টাকা ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেন। এই টাকা আলাদা ‘কনসলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্টে’ (সিসিএ) রাখা হয়, যা শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের পক্ষে শেয়ার কেনাবেচার জন্য ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্রোকারেজ হাউস ডুপ্লিকেট সার্ভার ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য দেখিয়ে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। তারা সিসিএ থেকে টাকা তুলে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে এবং সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএসইসি এই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আট সদস্যের প্যানেল থেকে ঝুঁকির ভিত্তিতে তিন সদস্যের পরিদর্শন দল গঠন করা হবে। প্যানেল গঠন ও পরিদর্শনের আদেশ জারির দায়িত্ব থাকবে বিএসইসির মার্কেট অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের (এমআইএডি) কমিশনার মো. নাফিজ আল তারিকের ওপর। পরিদর্শন দল কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ব্রোকারেজ হাউসে হাজির হবে এবং সিসিএ-তে অর্থের ঘাটতি, রেকর্ডের সঙ্গে প্রকৃত সিকিউরিটিজের মিল, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা, ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততা (আরবিসিএ) সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে কিনা এবং ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলছে কিনা, এই পাঁচটি বিষয় পরীক্ষা করবে।
নিয়মিত পরিদর্শনের সময়সূচি আগে থেকেই জানতে পারে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। ফলে তারা হিসাবের ঘাটতি সাময়িকভাবে পূরণ করে বা অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ পায়। কিন্তু অঘোষিত পরিদর্শনে এই সুযোগ থাকবে না। পরিদর্শনের দিন সকালে বিএসইসি অফিসে মিটিং করে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে একটি ব্রোকারেজ হাউস বেছে নেওয়া হবে এবং নোটিশ দেওয়ার আগেই পরিদর্শক দল ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বিএসইসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাঁরা মনে করছেন, নিয়মিত পরিদর্শনের পরিবর্তে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, অঘোষিত পরিদর্শন ও দ্রুত নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বোধ করবেন।

