পুঁজিবাজারে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ডেরিভেটিভস লেনদেন চালুর অনুমোদন দিয়েছে। আগামী ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিএসইতে দেশের প্রথম ডেরিভেটিভস পণ্যের লেনদেন শুরু হবে। ইনডেক্স ফিউচারস দিয়ে এই যাত্রা শুরু হবে। সম্প্রতি বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার সভাপতিত্ব করেন কমিশন চেয়ারম্যান মাসুদ খান। ডিএসইর দাখিল করা কর্মপরিকল্পনা অনুমোদনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন এই আর্থিক পণ্য চালুর প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
ডেরিভেটিভস হলো এমন একটি আর্থিক চুক্তি, যার মূল্য নির্ভর করে কোনো অন্তর্নিহিত সম্পদের ওপর, যেমন শেয়ার, সূচক বা পণ্যমূল্য। ডিএসইতে প্রথমে চালু হবে ইনডেক্স ফিউচারস, যা ডিএসইর প্রধান সূচকের ভবিষ্যৎ গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সহজ ভাষায়, কেউ যদি মনে করেন বাজার বাড়বে, তাহলে তিনি সূচকভিত্তিক ফিউচারস কিনতে পারেন। আর বাজার বাড়লে তিনি লাভ করবেন। আবার যদি বাজার কমে, তাহলে লোকসান হবে। সাধারণ শেয়ার লেনদেনের মতো এখানে সূচকের সব কোম্পানির শেয়ার কিনতে হয় না, শুধু চুক্তির ভিত্তিতে লাভ-লোকসান হয়। উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক ডিএসইর সূচক আছে ৫,৮০০ পয়েন্টে। কেউ যদি মনে করেন সূচক বাড়বে, তাহলে তিনি ৫,৮০০ পয়েন্টে ফিউচারস কিনলেন। পরে সূচক যদি ৫,৯০০ পয়েন্টে ওঠে, তাহলে তিনি ১০০ পয়েন্টের লাভ পাবেন। আর সূচক কমলে লোকসান হবে।
ডেরিভেটিভস লেনদেন চালু করতে ডিএসইকে নতুন লেনদেন ব্যবস্থা ও অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। ক্লিয়ারিং, নিষ্পত্তি, মার্জিন, জামানত ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। বিএসইসি নিয়মিতভাবে ডিএসইর কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে লেনদেন শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো প্রস্তুত থাকে। রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা প্রধান আকরামুল আলম বলেছেন, ‘ডেরিভেটিভস চালু করা পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উন্নয়ন। এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও উন্নত বিনিয়োগ কৌশলপ্রণেতাদের আকৃষ্ট করে বাজারের গভীরতা বাড়াবে।’ ডেরিভেটিভস বাজার ভবিষ্যতে ইনডেক্স ফিউচারসের বাইরে অন্যান্য পণ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যা বাজারের চাহিদা, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর নির্ভর করবে। ডেরিভেটিভসের জন্য কার্যকর ক্লিয়ারিং ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ধরনের পণ্যের জন্য কাউন্টারপার্টি ও নিষ্পত্তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে, ডেরিভেটিভস অনুমোদনের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পাঠানোর প্রক্রিয়াও সহজ করেছে বিএসইসি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে এনবিআর থেকে দ্বৈত কর পরিহার (ডিটিএ) সনদ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অনিবাসী বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের ঘোষিত লভ্যাংশ পাঠাতে হবে। পাশাপাশি, লভ্যাংশ পাঠানো সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। কোম্পানিগুলোকে প্রথমে স্থানীয় শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণ শেষে একটি প্রাথমিক সম্মতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। পরে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ পাঠানোর ৩০ দিনের মধ্যে বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে চূড়ান্ত সম্মতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা লভ্যাংশ দ্রুত পাবেন, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। ডিটিএ সনদ পেতে সময় লেগে যাওয়ায় আগে প্রায়ই সময়সীমা পার হয়ে যেত, কিন্তু নতুন নিয়মে লভ্যাংশ পাঠানোর সময়সীমা ডিটিএ সনদ পাওয়ার তারিখ থেকে গণনা করা হবে, যা আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিএসইসির পূর্বানুমোদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় স্পনসর বা পরিচালকদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত বা মৃত ব্যক্তির শেয়ার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আর বিএসইসির অনুমোদন লাগবে না। ফলে ঋণখেলাপির কারণে শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা বা মালিকের মৃত্যুতে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ পদক্ষেপে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
পুঁজিবাজারে ডেরিভেটিভস চালু করা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ পাঠানো সহজ করা এবং জেড ক্যাটাগরির শেয়ার হস্তান্তরে বিধিনিষেধ শিথিল করা, এই তিনটি সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে বৈচিত্র্য, বাড়ছে আস্থা। পুঁজিবাজার বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, আর এই বদলের অংশীদার হতে চলেছেন সব বিনিয়োগকারীই।

