সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই যেন বাজে বার্তা নিয়ে হাজির হলো পুঁজিবাজার। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এক লাফে ১০৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে। অথচ গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এই সূচক ছিল ৫ হাজার ৬৬২ পয়েন্ট। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এমন পতন—যেন সপ্তাহান্তের ছুটিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ছুটিতে চলে গিয়েছিল। আর এই পতনের সঙ্গে সঙ্গেই লেনদেনও কমে এসেছে ৫৪৫ কোটি টাকায়, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৭৬ কোটি টাকা কম।
শুধু সূচক নয়, পুরো বাজারজুড়ে যেন এক ভীতিকর নীরবতা। ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২০টির দর বেড়েছে, আর ৩৪৮টির দর কমেছে। অপরিবর্তিত রয়েছে মাত্র ২১টি। অর্থাৎ, প্রতি ২০টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ১৮টির শেয়ারদর পড়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চিত্র কোনো স্বাভাবিক সংশোধন নয়—বরং এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর আস্থাহীনতার ইঙ্গিত। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র—সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১ পয়েন্টে।
প্রশ্ন হচ্ছে—হঠাৎ কেন এই পতন? বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মূল কারণ দেশের চলমান শক্তি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের টানা ঘাটতিতে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাড়তি খরচে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা—এই সব মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন, সামনের প্রান্তিকে কোম্পানিগুলোর আয় কমতে পারে। আর এই ভয়ই তাদের শেয়ার বিক্রি করতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি, বাজারে নতুন কোনো ইতিবাচক সংকেত না থাকায় সূচকটি প্রায় দুই মাস পর ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে।
শুধু শক্তি সংকটই কি কারণ? বাজার বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। উল্টো, অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ইবিএল সিকিউরিটিজের দৈনিক বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজারের গতিপথ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শক্তিশালী আস্থার অভাবই দ্রুত মুনাফা তোলার প্রবণতা তৈরি করছে, যা বাজারের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। অর্থাৎ, যারা কিছুটা লাভে ছিলেন, তারাও এখন শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যাচ্ছেন; কারণ তাঁরা জানেন না, সামনে কী হতে পারে।
এই পতনের প্রভাব কিন্তু শুধু সূচক ও লেনদেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা; যাঁরা তাঁদের সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন; তাঁরা প্রতিদিনই পুঁজি হারাচ্ছেন। আর বাজারে যখন ৩৪৮টি কোম্পানির দর কমে, তখন তার মানে হলো, লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও সংকুচিত হচ্ছে। বাজার মূলধন কমছে, যা পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট সংকেত। কারণ পুঁজিবাজার যখন দুর্বল হয়, তখন কোম্পানিগুলোর পক্ষে নতুন বিনিয়োগ তোলা কঠিন হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে।
তবে কি এই পতন স্থায়ী হবে? সেটা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, শক্তি সংকট কখন সমাধান হয়। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেয়। ইতিমধ্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বিষয়ে কিছু ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, যা কিছুটা হলেও আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সেই আশা কি বাস্তবে রূপ পায়, নাকি আরও পতন ঘটে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আপাতত বিনিয়োগকারীদের জন্য অপেক্ষার পালা। আর পুঁজিবাজারের এই দুর্বলতা কি সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, সে প্রশ্নও কিন্তু থেকেই যায়।

