পুঁজিবাজারে করপোরেট বন্ডের তালিকা মাত্র ১৬টি। অন্যদিকে সরকারি বন্ড রয়েছে ২১৭টি আর তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩৬০টি। অর্থাৎ, কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শেয়ার বা সরকারি বন্ডের ওপর নির্ভর করলেও করপোরেট বন্ড ব্যবহার করছে খুব কম। এই অস্বাভাবিক চিত্র বদলাতে এবার বড় উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। তারা করপোরেট বন্ডের লিস্টিং ও অন্যান্য ফি ৮০ শতাংশ কমিয়েছে। আগে যেখানে কোনো বন্ড ইস্যু করতে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত বন্ডের আকারের ০.২৫ শতাংশ এবং ১০ কোটি টাকার বেশি হলে ০.১৫ শতাংশ ফি দিতে হতো, সেখানে এখন তা অনেক কমে গেছে।
বন্ড ইস্যুর এই উচ্চ ফি ছিল কোম্পানিগুলোর জন্য প্রধান বাধা। ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘লিস্টিং ফি কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন ডিএসইর মূল বোর্ডে বন্ড তালিকাভুক্ত করতে বেশি আগ্রহী হবে’। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করপোরেট বন্ড তালিকাভুক্ত হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংকের কথা বলেছেন, যারা ১ হাজার কোটি টাকার সোশ্যাল বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তা ডিএসইর মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করার শর্ত রেখেছে।
শুধু লিস্টিং ফি কমানোই যথেষ্ট নয়, এটি বোঝেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের গবেষণা প্রধান সেলিম আফজাল শাওন বলেছেন, ‘লিস্টিং ফি কমানো একটি স্বাগত পদক্ষেপ, কিন্তু শুধু এটাই যথেষ্ট নয়’। বন্ড বাজার চাঙ্গা করতে হলে সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্য বাড়াতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং ইস্যুকারীদের ঋণযোগ্যতা ও সুশাসনে আস্থা তৈরি করতে হবে। বর্তমানে খুচরা বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের ৯০ শতাংশ, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য করপোরেট বন্ডে লাভের সুযোগও কম নয়। বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেছেন, অনেক করপোরেট বন্ডের কুপন রেট এ-ক্যাটাগরির ব্যাংকের ছয় মাসের এফডিআর হারের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ফলে বিনিয়োগকারীরা কিছু করপোরেট বন্ড থেকে ১২ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পেতে পারেন। অর্থাৎ, কেউ যদি ১২ শতাংশ কুপন রেটের ১ লাখ টাকার বন্ড কেনেন, তাহলে বছরে প্রায় ১২ হাজার টাকা সুদ পাবেন এবং মেয়াদ শেষে ইস্যুকারী মূল টাকা ফেরত দেবে।
বাংলাদেশের বন্ড বাজারকে ঘিরে আশাবাদ বাড়ছে। লিস্টিং ফি কমানো ছাড়াও সম্প্রতি ট্রাস্ট ডিডের স্ট্যাম্প ডিউটি উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। এখন করপোরেট বন্ড ইস্যুতে স্ট্যাম্প ডিউটি ইস্যুর আকারের ০.১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকায় সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্য বাড়ানো, প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলকে বন্ড বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, এই কাজগুলো এখনো বাকি। বিএসইসি ইতিমধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিনিয়োগ কাঠামো পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছে, যাতে তারা পুঁজিবাজার ও করপোরেট বন্ড বাজারে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে।
করপোরেট বন্ড বাজার চাঙ্গা হলে কোম্পানিগুলো ব্যাংকঋণের বিকল্প পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য সস্তা অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করবে। আর বিনিয়োগকারীরাও পাবেন নিরাপদ ও লাভজনক স্থির আয়ের সুযোগ। ডিএসইর এই উদ্যোগ যদি সঠিক বাস্তবায়ন পায়, তাহলে আগামী দিনে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে করপোরেট বন্ডের সংখ্যা বাড়বে এবং বাজার আরও গতিশীল হবে।

