পুঁজিবাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শেয়ারে সরাসরি বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে বিনিয়োগের পরিধি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা এখন থেকে নন-কনভার্টিবল বন্ড, সরকারি সিকিউরিটিজ, ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইট) ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, ইটিএফ ও আরইআইট এখনো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে চালু হয়নি। আগে এই গোষ্ঠীর বিনিয়োগের পরিধি শুধু ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই নির্দেশনা গত সপ্তাহে কার্যকর হয়েছে।
এই নির্দেশনা কার কার ওপর প্রযোজ্য? বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, নির্দেশনাটি স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) এবং বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটস (বিএএসএম)-এর পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এমনকি বিএসইসির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীও এই বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছেন। বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমে কর্মরত সবার জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই কড়াকড়ি? পুঁজিবাজারে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকের হাতেই থাকে সংবেদনশীল তথ্য। ট্রেডিং, ক্লিয়ারিং, সেটেলমেন্ট, ডিপোজিটরি অপারেশন, কর্পোরেট অ্যাকশন বা অন্য কোনো বাজার কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে আসার আগেই তাদের কাছে পৌঁছে যায়। সেই তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ তৈরি হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই সরাসরি শেয়ার কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিএসইসি মুখপাত্রের ভাষায়, এটি শুধু কর্মীদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ সীমিত করার বিষয় নয়; বরং পেশাগত আচরণ ও বাজারের অখণ্ডতা জোরদারের একটি বড় প্রচেষ্টার অংশ।
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, শুধু কর্মীরা নন, তাদের নির্ভরশীল সদস্য অর্থাৎ ছেলেমেয়ে, বাবা-মা আগে বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্টও খুলতে পারতেন না। নতুন নির্দেশনায় অবশ্য তাদের বিও অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে শুধুমাত্র অনুমোদিত সেই নির্দিষ্ট বিনিয়োগ উপকরণগুলোতে বিনিয়োগের জন্যই। রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা প্রধান আকরামুল আলম বলেছেন, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার এই উদ্যোগটি ব্যক্তিগত বিনিয়োগের অধিকার সংরক্ষণ এবং বাজারের অখণ্ডতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি প্রচেষ্টা।
বিএসইসির এই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হবে? বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর সফলতা নির্ভর করছে সঠিক পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগের ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্টকব্রোকার বলেন, “কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি কার্যকর মনিটরিং ও ডিসক্লোজার ব্যবস্থা থাকা দরকার।” কার্যকর প্রয়োগের জন্য বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ ফার্ম, ডিপোজিটরি এবং সংশ্লিষ্ট বাজার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিএসইসি মুখপাত্র জানিয়েছেন, কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিষিদ্ধ লেনদেন যাতে না হয় তা নিশ্চিত করবে। অনুমোদিত উপকরণের বাইরে কোনো বিনিয়োগ পাওয়া গেলে সিকিউরিটিজ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

