মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে ওঠায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবার চড়া হতে শুরু করেছে, যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে শেয়ারবাজারেও। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ায় বিশ্বের বেশির ভাগ প্রধান শেয়ারসূচক গতকাল নিম্নমুখী ছিল, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে একশ ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের এই উর্ধ্বগতির পেছনে মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার তীব্রতা বৃদ্ধি, যা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাপণ্যের দামেও। ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানোর পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারে, অথবা নতুন করে সুদহার বাড়ানোর কথাও ভাবতে হতে পারে। এতে ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিনিয়োগে ভাটা পড়ার শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে, যা শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
হিসাব বলছে, প্রধান বৈশ্বিক তেলের বাজারদর প্রায় আড়াই শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল একশ ডলারের কিছু বেশি দামে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তেলের বাজারদরও প্রায় দুই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি পঁচানব্বই ডলারের কাছাকাছি চলে এসেছে।
ইউরোপের বাজারগুলোতে এই প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ফ্রান্সের প্রধান শেয়ারসূচক প্রায় এক শতাংশ কমে আট হাজার দুইশ পয়েন্টের ঘরে নেমে এসেছে। জার্মানির সূচকও কমেছে প্রায় এক শতাংশের কাছাকাছি, নেমে গেছে পঁচিশ হাজার সাতশর নিচে। যুক্তরাজ্যের প্রধান সূচকেও পতন দেখা গেছে, যা দশ হাজার সাতশ পয়েন্টের ঘরে অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন শুরুর আগেও কোনো ইতিবাচক সংকেত মেলেনি। প্রধান একটি সূচকের ভবিষ্যৎ অবস্থান প্রায় স্থিরই ছিল, তবে শিল্পভিত্তিক অন্য একটি বড় সূচকের ভবিষ্যৎ অবস্থানে হালকা পতন দেখা গেছে।
এশিয়ার বাজারে অবস্থা মিশ্র। জাপানের প্রধান সূচক কিছুটা কমে পঁয়ষট্টি হাজারের ঘরে নেমেছে, তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক বরং বেড়ে সাত হাজার পঞ্চাশ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। হংকংয়ের সূচকে সামান্য পতন হলেও চীনের মূল ভূখণ্ডের প্রধান সূচক কিছুটা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাজারও সামান্য নিম্নমুখী ছিল, আর তাইওয়ানের সূচকে দেখা গেছে ক্ষুদ্র উত্থান। ভারতের প্রধান সূচকও নিম্নমুখী প্রবণতায় ছিল।
এখন বিশ্ব বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য প্রকাশিতব্য মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনের দিকে, যা শুক্রবার প্রকাশ হওয়ার কথা। ওই প্রতিবেদনে গত বছরের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় কতটা বেড়েছে তার আভাস মিলবে। অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক পূর্বাভাস, আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমে সাড়ে তিন শতাংশের কাছাকাছি নামতে পারে, যা আগের মাসেও প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। তবে এই হার এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ ওপরে।
সামনের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী বৈঠক ঘিরে তাই বাড়তি গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। ওই বৈঠকে সুদহার নিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে, তা নির্ধারণ করে দিতে পারে সামনের কয়েক মাসের বাজার গতিপ্রকৃতি। উল্লেখ্য, সুদহার নিয়ে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে চাপ রয়েছে সুদহার কমানোর জন্য, ফলে এই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরেও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
একই সময়ে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আগামী সপ্তাহে সুদনীতি নিয়ে বৈঠকে বসছে, যেখানে বাজার পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন।
মুদ্রাবাজারেও প্রভাব পড়েছে সামান্য। জাপানি মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার কিছুটা কমে একশ তিপ্পান্ন দশমিক আট আটচল্লিশের ঘরে নেমে এসেছে, যা আগের দিন ছিল প্রায় একশ চুয়ান্নের কাছাকাছি।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক ঝুঁকির মুখোমুখি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সামরিক সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে, অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। ফলে সামনের দিনগুলোয় সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি সরবরাহের প্রকৃত অবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির প্রকৃত পরিসংখ্যানই নির্ধারণ করবে বাজারের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।
এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রণালি নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রণালিটির প্রবেশমুখে একটি বিদেশী চালকবিহীন পানির নিচের যান জব্দ করার দাবি জানিয়েছে একটি সামরিক বাহিনী। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নৌবাহিনীর একটি শাখা এই যান আটকের কথা জানিয়েছে।
এই ঘটনা মূলত সামরিক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান ব্যবহারের একটি বিরল বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জব্দ হওয়া যানটি একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটারের কাছাকাছি। এ ধরনের যান সাধারণত সমুদ্রতলে মাইন খুঁজে বের করা ও অপসারণ, সমুদ্রতলের মানচিত্র প্রস্তুত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পানির নিচে থাকা তার বা পাইপলাইনের মতো অবকাঠামো পরিদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রানীতির অনিশ্চয়তা একসঙ্গে মিলে আগামী দিনের অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে বড় প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।

