শেয়ারবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবেশ এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে গেল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ভেতরেই আলাদা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ হলো, এখন থেকে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু লেনদেন পরিচালনা করলেই চলবে না, একই সঙ্গে তাদের প্রতিটি গ্রাহকের প্রতিটি টাকার উৎস ও গন্তব্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিএফআইইউর জারি করা এক সার্কুলারে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, কারসাজি এবং বেনামি লেনদেনের অভিযোগে জর্জরিত। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি শেয়ারবাজারকে ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ সাদা করছেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের সুবিধার্থে লেনদেন পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন মামলা ও তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক থেকে অর্থপাচারের বড় একটি অংশ চলে গেছে পুঁজিবাজারের মাধ্যমেই। এমন পরিস্থিতিতে বিএফআইইউ মনে করছে, শুধু ব্যাংকিং খাতে নজরদারি বাড়ালে হবে না, পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমানভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর এ কারণেই নতুন ইউনিট গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট বা সিসিইউ গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে শাখা পর্যায়ে নিয়োগ দিতে হবে ব্রাঞ্চ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার (বিএএমএলকো)। এই দুই স্তরের কমপ্লায়েন্স কাঠামো মূলত প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি লেনদেন, গ্রাহক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে শেয়ার কেনাবেচা পর্যন্ত, নজরদারির আওতায় আনবে। বিএফআইইউর সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করে তা কার্যকর করতে হবে, যা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে।
গ্রাহক যাচাই বা কেওয়াইসি প্রক্রিয়ায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন হিসাব খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন সনদসহ নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রয়োজনে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে। এর বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহক বা প্রকৃত সুবিধাভোগীর (বিনিফিশিয়ারি ওনার) মধ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন কি না, তা শনাক্ত করতে হবে। সাধারণত কোনো কোম্পানির ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক অথবা মূল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকে প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে ধরা হয়। এমন ব্যক্তিদের হিসাব থাকলে তা বিশেষ নজরদারিতে থাকবে এবং তাদের লেনদেনে ‘অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ বা এডিডি নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণে। কোনো গ্রাহকের লেনদেন জটিল, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা আপাতদৃষ্টিতে অবৈধ মনে হলে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে বিএএমএলকোকে। এরপর কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট সেটি যাচাই করবে এবং প্রয়োজন হলে গো-এএমএল ওয়েব সিস্টেমের মাধ্যমে অবিলম্বে বিএফআইইউকে রিপোর্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট করার সময় সংশ্লিষ্ট তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, গ্রাহক যেন কোনোভাবেই জানতে না পারেন যে তার বিরুদ্ধে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
শুধু নজরদারি করলেই হবে না, নিজেরা কতটা ভালোভাবে কাজ করছেন, সেটাও যাচাই করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী প্রতি ছয় মাসে স্ব-মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে স্বাধীন যাচাই সম্পন্ন করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে তাদের নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের হিসাব বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হওয়ার তারিখ থেকে অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত সব তথ্য ও দলিল সংরক্ষণ করতে হবে।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এসব নির্দেশনার সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কী সম্পর্ক? আসলে এর প্রভাব পড়বে তাদের ওপরও। যখন পুঁজিবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবাহ কমবে, তখন বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সুস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম প্রকৃত মূল্যের কাছাকাছি থাকবে। বেনামি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারসাজি কমলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কম ঠকবেন। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে, অবশ্য চ্যালেঞ্জও আছে, ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে নতুন ইউনিট গঠন, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি সেটআপে বিনিয়োগ করতে হবে, যা তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়াতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই খরচগুলো বাজারের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলেই মনে করছে বিএফআইইউ।

