শেয়ারবাজারে কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট মূল্যের অস্বাভাবিক উত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আলোচনায় থাকা চারটি ফান্ড সর্বশেষ লভ্যাংশ দিয়েছিল ২০২৩ সালে, তারপর আর কোনো লভ্যাংশ না দেওয়া সত্ত্বেও গত ছয় মাসে এসব ফান্ডের ইউনিট দর বেড়েছে চুরাশি থেকে দুইশ সাঁইত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত।
এই সময়ে ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কোনো নতুন তথ্যও প্রকাশ পায়নি, বরং একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পেইড গ্রুপে নির্দিষ্ট ফান্ড নির্দিষ্ট দামে কেনার প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তদন্তে কিছু হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন, নিজেদের মধ্যে ইউনিট কেনাবেচা এবং পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা অবস্থায়ও ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
আলোচনায় থাকা চারটি ফান্ডের মধ্যে দুটি সর্বশেষ তিন শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছিল, একটি সাড়ে চার শতাংশ এবং আরেকটি দশ শতাংশ হারে। এরপর থেকে কোনো ফান্ডই আর লভ্যাংশ দেয়নি।
গত ছয় মাসের বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চারটি ফান্ডের প্রতিটির ইউনিট দর প্রায় দ্বিগুণ থেকে সাড়ে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে—একটির দর বেড়েছে দেড়শ শতাংশের বেশি, একটির চুরাশি শতাংশের মতো, একটির দুইশ সাঁইত্রিশ শতাংশ এবং একটির প্রায় একশ তিন শতাংশ। অর্থাৎ লভ্যাংশ না দেওয়া সত্ত্বেও স্বল্প সময়ে এই ধরনের ব্যাপক দরবৃদ্ধি বাজার বিশ্লেষকদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
দরবৃদ্ধির সময়ে এক ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেইড গ্রুপে নির্দিষ্ট ফান্ড কেনার নির্দেশনা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে কখন কোন ফান্ড কত দামে কিনতে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছিল। তার পরিচালিত একটি পেইড গ্রুপে বার্ষিক সদস্য ফি নেওয়া হয় এবং সেখানে বাজার বিশ্লেষণ ও ফোনে পরামর্শ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথ নিবন্ধন ছাড়া এ ধরনের বিনিয়োগ পরামর্শ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শদাতাদের এমন প্রচারণায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রভাবিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তাদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ওই ব্যক্তি বিভিন্ন গ্রুপে দাবি করেছেন, তার হাজার হাজার গ্রাহকের কয়েকশ কোটি টাকার তহবিল তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে এই দাবি সম্পর্কে তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একটি ফান্ডের দরবৃদ্ধি ও লেনদেন নিয়ে জুলাই-আগস্ট মাসে বিস্তারিত তদন্ত চালায় ডিএসই। তদন্তে দেখা যায়, শীর্ষ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ একই ব্রোকারেজ হাউসের গ্রাহক, এবং ওই সামাজিক মাধ্যম গ্রুপ পরিচালনাকারী ব্যক্তি নিজেও ছিলেন শীর্ষ ক্রেতা-বিক্রেতাদের তালিকায়। একটি হিসাব থেকে লাখ লাখ ইউনিট কেনাবেচা হয়েছে প্রায় সমপরিমাণে, যা একই পক্ষের মধ্যে ইউনিট আদান-প্রদানের সন্দেহ তৈরি করে। আরও দুটি হিসাব থেকেও একই ধরনের প্রায় সমান পরিমাণ কেনাবেচার প্রমাণ মিলেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকা সত্ত্বেও দুটি গ্রাহকের হিসাবে বড় অঙ্কের ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় মার্জিন চুক্তি না থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি নির্দিষ্ট দিনে সংশ্লিষ্ট তিনটি বিও হিসাব একই ব্রোকারেজ টার্মিনাল ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে একাধিকবার লেনদেন করেছে, যাকে বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের চিত্র তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে ডিএসই।
দরবৃদ্ধির সময়ে একটি ফান্ডের মালিকানা কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জুন মাসের শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ ছিল প্রায় চব্বিশ শতাংশ, যা জুলাই শেষে বেড়ে চল্লিশ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। তবে আগস্ট শেষে এই অংশ আবার দ্রুত কমে যায়, একই সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ বেড়ে প্রায় উনষাট শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কম দামে কেনা ইউনিট দাম বাড়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন—জুনে যেখানে ইউনিট কেনা হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন টাকায়, পরে তা প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে।
এ বিষয়ে একটি ব্রোকারেজ হাউসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেন, দীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়া এবং সম্পদমূল্য কমার পরও কোনো ফান্ডের ইউনিট দর এত দ্রুত বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়, এবং সামাজিক মাধ্যমে কেনার প্রচারণা ও সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ থাকলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাত পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে অতীতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। তিনি জানান, এই আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কর্মদক্ষতা নির্দেশক নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা পুঁজিবাজারে দুর্বল নজরদারির একটি সাধারণ প্রবণতাকেই তুলে ধরে—যেখানে অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক মাধ্যম প্রভাবক এবং সমন্বিত লেনদেনের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে মুনাফা তুলে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের কারসাজি কার্যকরভাবে ঠেকাতে হলে শুধু তদন্ত নয়, বরং দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

