কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, সফটওয়্যার, গণমাধ্যম এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও দ্রুত বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এআই অবকাঠামো তৈরিতে বড় ধরনের উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছে।
দেশে এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিক প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশে এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এডিক দেশের গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত অর্থনৈতিক এলাকায় এআই ডেটা সেন্টার স্থাপন করতে চায়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নিজস্ব এআই সক্ষমতা তৈরি হবে। বাংলা ভাষাভিত্তিক বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরি, এআই গবেষণা এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরাসরি প্রায় ১০ হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ৫০ হাজারের বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদে ৬০ হাজারের বেশি পরিবার উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডেটা সেন্টার অবকাঠামো সম্প্রসারণে সরকারের লক্ষ্য:
এআই ডেটা সেন্টারে বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সরকারের লক্ষ্য হলো ডেটা সেন্টারকে ভিত্তি করে দেশের এআই সক্ষমতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে স্টার্টআপ, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্ভাবকেরা নতুন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ও সেবা তৈরি করতে পারবেন। এদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান, এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিরা প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়েনি।
‘এআই ফ্যাক্টরি’ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা:
এডিক প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের প্রথম ‘ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার ও কোয়ান্টাম-রেডি সোভরেন কম্পিউট ক্যাম্পাস’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সহযোগিতা চেয়ে একটি কৌশলগত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। প্রস্তাবনাটি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এআই অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও রেইভেন্সবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এস এম আনিসুর রহমানের স্বাক্ষরে পাঠানো হয়েছে।
এস এম আনিসুর রহমান জানান, এই বিনিয়োগ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীর সমন্বয়ে গঠিত বিনিয়োগকারীদের জোটের মাধ্যমে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণ ডেটা সেন্টারের চেয়ে তাদের পরিকল্পনা ভিন্ন। লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়, বরং বাংলাদেশকে একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা।
তার ভাষ্য, গার্মেন্টস শিল্প যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি তৈরি করেছে, তেমনি ভবিষ্যতে এআই অবকাঠামো প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হতে পারে। এই অবকাঠামোর মাধ্যমে সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন ও এআইভিত্তিক বিভিন্ন সেবা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠবে এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন ইকোসিস্টেম তৈরি হবে বলে তিনি জানান।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে এআই ডেটা সেন্টার:
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে আগামী ২৪ মাসের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার তৈরি করা হবে। এতে উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামো থাকবে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেবা দেবে।
দ্বিতীয় ধাপে ২৪ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে সক্ষমতা বাড়িয়ে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক এআই কম্পিউটিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় ধাপে যুক্ত হবে কোয়ান্টাম-প্রস্তুত প্রযুক্তি। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে এআই গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের অনেক তথ্য ও ডিজিটাল সেবা বিদেশি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব এআই ডেটা সেন্টার তৈরি হলে দেশের তথ্য দেশের মধ্যেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমার পাশাপাশি তথ্য নিরাপত্তাও বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষাভিত্তিক বৃহৎ ভাষা মডেল তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের তথ্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষণের সুবিধাও পাওয়া যাবে।
এআই ডেটা সেন্টারের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। তাই প্রকল্পের সঙ্গে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বড় প্রযুক্তি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ ইতিবাচক। তবে সরকারি অর্থে নতুন বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে দেশে বিদ্যমান ডেটা সেন্টারগুলোর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা বেশি কার্যকর।
বাক্কোর সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম বলেন, এআই বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সঠিকভাবে এআই ব্যবহার করতে পারলে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ব্যবধান কমানো সম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু তথ্যের ওপর নির্ভর করবে না, বরং তথ্য ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। তার মতে, এআই ডেটা সেন্টার শুধু সার্ভার রাখার জায়গা নয়। এটি একটি দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি।
বিশ্বজুড়ে চলছে এআই অবকাঠামোর প্রতিযোগিতা:
এআই প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব এবং এশিয়ার মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো দেশগুলোতে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণ চলছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করা বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এআই বিশেষজ্ঞদের অনেকেই দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এআই যুগে যারা শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করতে পারবে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নেতৃত্বেও তারাই এগিয়ে থাকবে।

