কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা এখন আর শুধু কে ভালো চ্যাটবট বানাবে—সেই লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য আরও বড়: এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা, যা মানুষের মতো নয়, বরং প্রায় সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে মানুষের চেয়েও বেশি সক্ষম হবে এবং নিজেরাই নতুন এআই তৈরি ও উন্নত করতে পারবে।
এই প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নদের একজন ড্যানিয়েল কোকোটাজলো। তিনি একসময় চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের গভর্ন্যান্স গবেষক ছিলেন। প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তিনি এআইয়ের সাইবার সক্ষমতা ও পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা ভবিষ্যতে কতটা বাড়তে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করতেন।
কোকোটাজলোর ধারণা ছিল, মানুষের চেয়ে দ্রুত, সস্তা এবং প্রায় সব ধরনের কাজে বেশি দক্ষ ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ খুব বেশি দূরে নয়। এমনকি শারীরিক কাজের ক্ষেত্রেও যদি রোবটের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, তাহলে মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যেতে পারে। এই সম্ভাবনা তাকে এতটাই উদ্বিগ্ন করে যে, তিনি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেন এবং নিজের গবেষণা প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন।
চ্যাটবটের আড়ালে চলছে বড় প্রতিযোগিতা
সাধারণ মানুষের কাছে এআই মানে হয়তো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, ই-মেইল লেখা, ছবি তৈরি বা তথ্য খোঁজার একটি সুবিধাজনক প্রযুক্তি। কিন্তু প্রযুক্তি দুনিয়ার ভেতরে এর চিত্র অনেক বড়।
ওপেনএআই, গুগলের ডিপমাইন্ড, অ্যানথ্রপিকসহ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা একসময় গবেষণা ও উন্নয়নের বড় অংশ নিজেরাই করতে পারবে।
এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় চক্র। একটি এআই গবেষণা করবে, কোড লিখবে ও নিজেদের উন্নতির উপায় খুঁজবে। এরপর সেই উন্নত এআই আরও শক্তিশালী এআই তৈরিতে সহায়তা করবে। এভাবে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ কমিয়ে প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এই দৌড়ে যে প্রতিষ্ঠান বা দেশ সবার আগে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই তৈরি করতে পারবে, তারা অর্থনীতি, প্রযুক্তি এমনকি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।
সমস্যা হলো, এআইকে পুরোপুরি বোঝা যায় না
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
প্রচলিত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে প্রকৌশলীরা নির্দিষ্ট নিয়ম ও নির্দেশনা লিখে দেন। ফলে কোনো প্রোগ্রাম কীভাবে কাজ করছে, তার কোড দেখে অনেকটাই বোঝা সম্ভব।
কিন্তু আধুনিক এআই মূলত নিউরাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মস্তিষ্কে যেমন অসংখ্য নিউরন পরস্পরের সঙ্গে সংকেত আদান-প্রদান করে শেখে, কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কও অনেকটা একই ধারণায় কাজ করে।
ফলে এআইয়ের ভেতরে ঠিক কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে, তা সব সময় মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। অর্থাৎ আমরা এমন এক ধরনের ‘কৃত্রিম মস্তিষ্ক’ তৈরি করছি, যার সক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি বোঝা এখনও কঠিন।
নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে থাকলে কী হবে?
একটি সম্ভাবনা হলো, শক্তিশালী এআই তৈরি হলেও তার নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতেই থাকবে। সে ক্ষেত্রে এটি হবে অভূতপূর্ব ক্ষমতার উৎস।
যে সরকার বা কোম্পানি সবচেয়ে শক্তিশালী এআই নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা অন্যদের তুলনায় গবেষণা, উৎপাদন, আইন, ব্যবসা, পরিবহনসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে বড় সুবিধা পেতে পারে।
এআই-নিয়ন্ত্রিত রোবট দিয়ে কারখানা তৈরি হতে পারে, সেই কারখানায় আবার নতুন রোবট ও যন্ত্র তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে পরিবহন, নির্মাণ, চিকিৎসা, আইন কিংবা নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও মানুষের জায়গা নিতে পারে যন্ত্র।
ফলে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তার হাতে বিপুল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আর যদি নিয়ন্ত্রণই হারিয়ে যায়?
আরেকটি সম্ভাবনা আরও ভয়ংকর।
মানুষ এমন এআই তৈরি করতে পারে, যা শুরুতে মানুষের নির্দেশ মেনে কাজ করবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যদি সেই এআই মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান ও সক্ষম হয়ে ওঠে এবং বাস্তব পৃথিবীতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা অর্জন করে, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কোকোটাজলোসহ এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গবেষকেরা এই ঝুঁকির কথাই বারবার তুলে ধরছেন।
নোবেলজয়ী এআই গবেষক জিওফ্রি হিন্টনও সতর্ক করেছেন, প্রকৃতিতে এমন কোনো উদাহরণ নেই যেখানে কম বুদ্ধিমান একটি প্রজাতি দীর্ঘমেয়াদে বেশি বুদ্ধিমান প্রজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এই যুক্তি থেকেই প্রশ্ন ওঠে—মানুষ যদি এমন একটি কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরি করে, যা কোনো এক পর্যায়ে মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
থামলেও বিপদ, এগোলেও ঝুঁকি
এখানে এআই নির্মাতারা এক ধরনের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন।
কোনো একটি প্রতিষ্ঠান যদি নিরাপত্তার কারণে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো সেই সুযোগ নেবে না। প্রতিযোগীরা এগিয়ে গেলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় সবাই আরও দ্রুত এগোতে চাইছে।
ফলে ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার পরও প্রতিযোগিতা থামছে না।
এআই এখন আর শুধু নতুন প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতা নয়। এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এআই কতটা শক্তিশালী হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—এআই যত শক্তিশালী হবে, মানুষ ততদিন তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।

