বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন সরকারের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের পোর্টফোলিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান পালসটেক লিমিটেডে বিনিয়োগ থেকে প্রথম সফল এক্সিট সম্পন্ন করেছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে দেশের উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক্সিট প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে আইসিটি বিভাগের সচিব ও স্টার্টআপ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশীদ ভূঁঞা, স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল হাই এবং পালসটেকের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশীদ ভূঁঞা বলেন, স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা। তার মতে, প্রথম সফল এক্সিট শুধু একটি আর্থিক ঘটনা নয়; এটি দেশের স্টার্টআপ খাতের ক্রমবর্ধমান পরিপক্বতার প্রতিফলন।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী নূরুল হাই বলেন, প্রতিষ্ঠানটি শুধু বিনিয়োগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে করে না। এক্সিটের পরও পোর্টফোলিওভুক্ত স্টার্টআপগুলোকে কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই টেকসই উদ্যোক্তা পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
পালসটেকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরেফীন রাফী আহমেদ বলেন, স্টার্টআপ বাংলাদেশ শুরু থেকেই তাদের ওপর আস্থা রেখেছিল এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার ভাষ্য, এই এক্সিট প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশে বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো প্রতিভা ও উদ্যোক্তা সক্ষমতা রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক রিটার্ন তৈরির সুযোগও আছে।
স্টার্টআপ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের ৩৬টি সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু মূলধন সরবরাহ নয়, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কৌশল নির্ধারণ, নেটওয়ার্কিং ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, সফল এক্সিটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে।
পালসটেক ২০২৪ সালে স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পাওয়ার পর দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটায়। স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটি ফার্মাসিউটিক্যাল বিতরণ, এমবেডেড ফাইন্যান্সিং, সফটওয়্যার-ভিত্তিক সেবা এবং ওয়ান ফার্মেসি ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্ককে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে দেশের বৃহৎ কিন্তু খণ্ডিত ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের সময় বার্ষিক রাজস্ব ছিল প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি হয়েছে। গত ১৮ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে কোম্পানিটি।
বর্তমানে পালসটেক ১৪ হাজারের বেশি ফার্মেসিকে সেবা দিচ্ছে। তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে ওষুধ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
স্টার্টআপ খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, ভেঞ্চার ক্যাপিটালে সফল এক্সিট কোনো দেশের উদ্যোক্তা পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি দেখায় যে বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠান শুধু টিকে থাকেনি, বরং এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বিনিয়োগকারী মূল্য আদায় করতে পেরেছে। বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও সরকারি ও বেসরকারি তহবিলকে স্টার্টআপ খাতে আকৃষ্ট করতে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে এই ধরনের সফলতা পুনরাবৃত্তি করতে হলে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের প্রথম সফল এক্সিট সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

