মহাকাশে রকেট পাঠানোর জন্য শুধু একটি লঞ্চপ্যাড যথেষ্ট নয়। দরকার জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, রকেট প্রস্তুত করার অবকাঠামো এবং হাজার হাজার কর্মীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এবার সেই ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে স্পেসএক্স। যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার উপকূলে প্রায় ১২৫ হাজার একর জমিতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল মহাকাশকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্টারবেস লুইজিয়ানা’। ভারমিলিয়ন প্যারিশের পেকান আইল্যান্ড এলাকায় তৈরি হতে যাওয়া এই কেন্দ্র হবে স্পেসএক্সের সবচেয়ে বড় উৎক্ষেপণ অবকাঠামো। কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ২০২৯ সালে প্রথম স্টারশিপ উৎক্ষেপণের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি স্পেসএক্সের ২০২৯ সালের লক্ষ্য এবং লুইজিয়ানা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের প্রাথমিক কার্যক্রম ২০৩০ সালে শুরু হওয়ার হিসাব এক নয়। অর্থাৎ ২০২৯ সালের উৎক্ষেপণ এখনো একটি উচ্চাভিলাষী কোম্পানি-লক্ষ্য, নিশ্চিত সময়সূচি নয়।
শুধু রকেট উড়বে না, তৈরি হবে একটি ‘নিজস্ব শহর’
স্পেসএক্স যে অবকাঠামো বানাতে চাইছে, সেটিকে সাধারণ একটি রকেট লঞ্চ সেন্টার ভাবলে ভুল হবে। পরিকল্পনায় রয়েছে পাঁচটি লঞ্চ কমপ্লেক্স, প্রতিটিতে দুটি করে লঞ্চপ্যাড অর্থাৎ মোট ১০টি প্যাড। এর পাশাপাশি থাকবে নিজস্ব মিথেন উৎপাদন ও প্রপেল্যান্ট অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, রকেট প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কর্মীদের আবাসন। ভবিষ্যতে একটি বিমানবন্দরও যুক্ত হতে পারে। লক্ষ্য হলো এমন একটি ‘সেল্ফ-সাসটেইনিং’ স্পেসপোর্ট তৈরি করা, যেটিকে বাইরের অবকাঠামোর ওপর তুলনামূলক কম নির্ভর করতে হবে।
এত বড় বিনিয়োগের পেছনে আসলে স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ ব্যবসার হিসাব রয়েছে। স্টারশিপকে শুধু চাঁদ বা মঙ্গল অভিযানের রকেট হিসেবে দেখছে না প্রতিষ্ঠানটি। পুনর্ব্যবহারযোগ্য এই রকেটের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক স্যাটেলাইট অবকাঠামো তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সঙ্গে স্টারশিপকে যুক্ত করছে স্পেসএক্স। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচিতেও স্টারশিপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এতগুলো লঞ্চপ্যাড কেন? উত্তরটা রকেটের আকারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, লঞ্চের সংখ্যা। স্পেসএক্স ভবিষ্যতে বছরে হাজার হাজার স্টারশিপ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা তৈরি করতে চায়। অর্থাৎ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোকে তারা বছরে কয়েকটি বড় মিশনের ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং অনেকটা নিয়মিত শিল্প উৎপাদনের মতো উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির কার্যক্রমে পরিণত করতে চাইছে। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে স্টারশিপের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা, দ্রুত রিফ্লাইট, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বিশাল অবকাঠামো সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাই হাজার হাজার উৎক্ষেপণ এখনো ভবিষ্যৎ সক্ষমতার লক্ষ্য, বর্তমান বাস্তবতা নয়।
অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ, কিন্তু জমিটিও সাধারণ নয়
লুইজিয়ানার জন্য প্রকল্পটির আকর্ষণ শুধু মহাকাশ নয়, অর্থনীতিও। লুইজিয়ানা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের হিসাবে, আগামী ১০ বছরে সরাসরি প্রায় ৩ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। এসব চাকরির গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ৯২ হাজার ৬০০ ডলার। পাশাপাশি পরোক্ষভাবে আরও ৮ হাজার ১০০-এর বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার হিসাব দিয়েছে রাজ্য সংস্থাটি। ফলে একটি রকেট প্রকল্পের প্রভাব শুধু স্পেস ইন্ডাস্ট্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, নির্মাণ, আবাসন, সেবা ও স্থানীয় ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। ১২৫ হাজার একর জায়গাটি সাধারণ শিল্পাঞ্চল নয়; এটি উপকূলীয় জলাভূমি। স্পেসএক্স বলছে, পুরো এলাকার বড় অংশ প্রাকৃতিক জলাভূমি হিসেবেই থাকবে এবং পরিবেশ ও উপকূল পুনরুদ্ধারে অর্থ ব্যয় করা হবে। রাজ্য সরকারও প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উপকূল সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের একাংশের আশঙ্কা, রকেট উৎক্ষেপণের শব্দ, আলো, বর্জ্য ও অন্যান্য কার্যক্রম এই সংবেদনশীল পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জমির সঙ্গে অতীতের পরিবেশগত বিরোধও জড়িয়ে আছে। পেকান আইল্যান্ডের এই এলাকা একসময় এক্সনমোবিলের মালিকানাধীন ছিল এবং উপকূলীয় জলাভূমি ক্ষয়ের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘ আইনি বিরোধ ছিল। চলতি বছরের জুনে সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়, এরপর জুলাইয়ে মামলা খারিজের পথ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই স্পেসএক্সের প্রকল্পটি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে লুইজিয়ানার নতুন ‘স্টারবেস’ শুধু মহাকাশ প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে শিল্পায়ন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজারও পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে, লুইজিয়ানায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের স্টারবেস স্পেসএক্সের জন্য আরেকটি লঞ্চপ্যাড তৈরির পরিকল্পনা নয়। এটি এমন একটি মহাকাশ অবকাঠামো তৈরির চেষ্টা, যেখানে রকেট তৈরি, পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ, উৎক্ষেপণ এবং পুনরায় ব্যবহারের পুরো ব্যবস্থাকে এক জায়গায় এনে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। সফল হলে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর খরচ ও গতি দুটিতেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রকল্পটির সামনে প্রযুক্তিগত, নিয়ন্ত্রক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও কম নয়। শেষ পর্যন্ত স্টারবেস লুইজিয়ানার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কত বড় রকেট উড়ল তার ওপর নয়; এত বড় একটি মহাকাশ অর্থনীতিকে কত দ্রুত, নিরাপদ এবং টেকসইভাবে বাস্তবে নামানো গেল, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

