কালো-লাল রঙের একটি প্লাস্টিকের নল, দেখতে অনেকটা সাধারণ কোনো পাত্রের মতোই। এর ওপরের দিকে রয়েছে একাধিক গোলাকার ছিদ্র, আর ভেতরে থাকে পানি ও দেশীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি একধরনের বিশেষ উপাদান। এই উপাদানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই ডিম পাড়তে আসে স্ত্রী এডিস মশা—কিন্তু সেই ডিম থেকে আর কখনোই জন্ম নিতে পারে না নতুন কোনো মশা।
এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে তৈরি এই বিশেষ ফাঁদের নাম দেওয়া হয়েছে ডেন-এক্স ট্র্যাপ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ বছরের নিরলস গবেষণার পর তৈরি হয়েছে এটি। গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, ফাঁদটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে স্ত্রী এডিস মশা এটিকে নিরাপদ প্রজননস্থল ভেবে সেখানে ডিম পাড়ে, কিন্তু ডিম পাড়ার পরপরই ফাঁদের ভেতরের বিশেষ উপাদানের প্রভাবে সেই ডিম নষ্ট হয়ে যায়—ফলে মশার বংশবৃদ্ধির চক্রই থমকে যায়।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণত পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে কীটনাশক ছিটানো, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার মতো প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এডিস মশা মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে সামান্য পরিমাণ স্বচ্ছ পানিতেই ডিম পাড়তে সক্ষম, যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন নয়, মশার প্রজননস্থল সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ—আর ঠিক এই জায়গাতেই কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে এই ফাঁদ।
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক জানান, এডিস মশাকে আকৃষ্ট করার উপযোগী একটি পরিবেশ তৈরি করেই ফাঁদটি বানানো হয়েছে। স্ত্রী মশা সেখানে ডিম পাড়লেও সেই ডিম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের মশা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কম খরচে তৈরি, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—এমন একটি প্রযুক্তি তৈরিই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।
এই ফাঁদ তৈরির পেছনে রয়েছে বিদেশি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। জাপানে পিএইচডি গবেষণার সময় তিনি বিদেশি একটি প্লাস্টিকের মশার ফাঁদ ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু সেই ফাঁদ দেশে আনতে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন বিপুল খরচ ও নানা জটিলতার। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, একটি বিদেশি ফাঁদ আমদানি করতে খরচ পড়তে পারে বাইশ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত—যা বাংলাদেশের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশে ব্যাপক আকারে ব্যবহারের জন্য মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। এই উপলব্ধি থেকেই দেশীয় উপকরণ দিয়ে কম খরচে একই রকম কার্যকর একটি বিকল্প তৈরির চিন্তা মাথায় আসে তাঁর।
এরপর শুরু হয় নানা নকশা নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রথমে মাটির পাত্র, তারপর বাঁশের পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল—এভাবে একের পর এক উপকরণ ব্যবহার করে পরীক্ষা চালানো হলেও প্রত্যাশিত ফল না মেলায় বারবার নকশা বদলাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্লাস্টিকের পাইপের নকশায় তৈরি হয় বর্তমান ডেন-এক্স ট্র্যাপ, এবং এর লাল-কালো রঙও নির্বাচিত হয়েছে গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতেই। গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, এডিস মশা নির্দিষ্ট কিছু রঙের প্রতি তুলনামূলক বেশি আকৃষ্ট হয়, আর সেই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েই ফাঁদটিকে মশার কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।
এই ফাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মশাকে আকৃষ্ট করার বিশেষ উপাদানটি। বিদেশি ব্যয়বহুল কোনো রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে গবেষকেরা এ জন্য বেছে নিয়েছেন দেশীয় উদ্ভিদ। শতাধিক দেশীয় গাছগাছড়া নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ আকর্ষক উপাদান, যা স্ত্রী এডিস মশাকে ফাঁদের দিকে টেনে আনে এবং সেখানে ডিম পাড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
এডিস মশার জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে লক্ষ্য করেই তৈরি হয়েছে এই কৌশল। স্ত্রী মশা সাধারণত এমন স্থান খোঁজে, যেখানে তার বংশধরদের বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ থাকবে—আর ফাঁদটি ঠিক সেই স্বাভাবিক প্রবণতাকেই কাজে লাগায়। মশা ফাঁদটিকে নিরাপদ প্রজননস্থল ভেবে ডিম পাড়লেও, ডিম থেকে লার্ভা বা পূর্ণাঙ্গ মশা তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সেখানে বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়।
ডেন-এক্স ট্র্যাপ চালাতে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না, নেই কোনো মোটর বা জটিল যন্ত্রাংশও। ফলে এটি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনামূলক সহজ, এবং একটি ফাঁদ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব বলে দাবি গবেষকদের। এতে বাড়ির আশপাশে ব্যাপক হারে কীটনাশক ছড়ানোরও প্রয়োজন পড়ে না।
তবে গবেষকেরা এই ফাঁদকে কীটনাশকের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক ও সমন্বিত কৌশলের একটি অংশ হিসেবেই এটি ব্যবহার করা উচিত—পাশাপাশি বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া, লার্ভার উৎস ধ্বংস করা এবং প্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহারের মতো প্রচলিত পদ্ধতিগুলোও চালিয়ে যেতে হবে।
গবেষণাগারে সফলতার পর ফাঁদটির প্রকৃত কার্যকারিতা যাচাই করতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাভারের বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, ঢাকা মহানগর এবং চট্টগ্রামের একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ একাধিক স্থানে বাস্তব পরীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রতিটি ফাঁদে গড়ে সপ্তাহে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এই মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেই ফাঁদের নকশা ও কার্যপ্রণালিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গবেষক দলের একজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী জানান, বর্ষা মৌসুমে যেহেতু এডিস মশার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে, তাই ওই সময় ফাঁদে লার্ভার পরিমাণও তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। এলাকাভেদেও ফলাফলে ভিন্নতা দেখা গেছে—যেসব অঞ্চলে এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, সেসব এলাকার ফাঁদে লার্ভার পরিমাণও ছিল বেশি, আর কম ঘনত্বের এলাকায় ফলাফলও ছিল সেই অনুপাতে কম।
বর্তমানে কক্সবাজারের একটি শরণার্থীশিবিরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই ফাঁদ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছে। আগামী নভেম্বরে একটি জরিপ শেষে সেখানকার প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে প্রতিবছরই নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও ক্রমশ বাড়ছে।
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক বলেন, গবেষণাগারে কোনো প্রযুক্তি কার্যকর প্রমাণিত হওয়া আর বাস্তব পরিবেশে তা কার্যকর হওয়া—দুটো একেবারেই ভিন্ন বিষয়। তাই বিভিন্ন পরিবেশে ফাঁদটি ব্যবহার করে তার কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। তাঁর মতে, একটি বাড়ির চার কোণে যদি চারটি ফাঁদ বসানো যায়, তাহলে এডিস মশার বংশবিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব। বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সীমিত পরিসরে এটি উৎপাদন করা হলেও, বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে হলে উৎপাদন খরচ ও ব্যবসায়িক লাভের হিসাব বিবেচনা করেই এর দাম নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।

