দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশের অনুমোদন পেয়েছে বাংলালিংক। মোবাইল অপারেটরটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনইও পিএসপি লিমিটেডকে পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) হিসেবে কাজের চূড়ান্ত লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম ও শর্ত মেনে প্রতিষ্ঠানটি দেশে পেমেন্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দিতে পারবে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনইও পিএসপিকে পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪ এর ৫(৪) ধারার অধীনে এই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। পিএসপি লাইসেন্সের অর্থ সরাসরি ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার অনুমতি নয়। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ও তদারকির আওতায় ডিজিটাল পেমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট সেবা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হওয়া। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে এনইও পিএসপি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে পেমেন্ট সেবা চালুর প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছিল। এবার চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরুর জন্য আরও পরিষ্কার নিয়ন্ত্রক কাঠামো পেল।
বাংলালিংকের এই উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল লেনদেনের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে। এত দিন ব্যাংক, আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতারা এই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন বড় একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানও পেমেন্ট সেবায় সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেবার মান, ব্যবহার সহজতা ও খরচ নিয়ে প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে।
বাংলালিংকের জন্য এই ব্যবসায় যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে তাদের বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। মোবাইল ফোন ইতোমধ্যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই একই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে পেমেন্ট সেবা যুক্ত করতে পারলে গ্রাহকের কাছে ডিজিটাল লেনদেন পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। বিশেষ করে অনলাইন কেনাকাটা, দোকানে কিউআর কোডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ডিজিটালভাবে টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন সেবা যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ছোট দোকান, অনলাইন ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদ টাকার পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলে লেনদেনের হিসাব রাখা সহজ হয় এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। বাংলালিংকের নতুন পেমেন্ট সেবা এই বাজারে কতটা জায়গা তৈরি করতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের সেবা আনে, ব্যবসায়ীদের জন্য খরচ কত রাখে এবং সাধারণ গ্রাহকের কাছে ব্যবহার কতটা সহজ করে তুলতে পারে তার ওপর।
তবে এই বাজারে শুধু বড় গ্রাহকভিত্তি থাকলেই সফল হওয়া যাবে না। ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তা ও আস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রাহকের টাকা, ব্যক্তিগত তথ্য ও লেনদেনের তথ্য সুরক্ষিত রাখা, প্রতারণা ঠেকানো এবং কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পিএসপি লাইসেন্সের আওতায় কাজ করতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত আইন, বিধি ও শর্ত মেনে চলতে হবে। এর আগে প্রাথমিক অনুমোদনের সময়ও অর্থপাচার প্রতিরোধ, গ্রাহক যাচাই, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং তথ্য সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এনইও পিএসপি যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বা ই-ওয়ালেট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ এ দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আইপে সিস্টেমস, ডি মানি বাংলাদেশ, রিকারশন ফিনটেক, গ্রিন অ্যান্ড রেড টেকনোলজিস, প্রগতি সিস্টেমস, এবিজি টেকনোলজিস, ডিজিটাল পেমেন্টস, শেবা ফিনটেক এবং শমাধান সার্ভিসেস রয়েছে।
বাংলালিংকের জন্য তাই এটি শুধু নতুন একটি সেবা চালুর বিষয় নয়; টেলিযোগাযোগ ব্যবসার বাইরে ডিজিটাল আর্থিক সেবায় নিজেদের অবস্থান তৈরিরও একটি উদ্যোগ। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর জন্য প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়ার সময়ও ডিজিটাল পেমেন্টে মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল। এখন চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই এই বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতা বাড়লেই বাজারের সুফল নিশ্চিত হবে না। নিরাপদ লেনদেন, সহজ ব্যবহার, কম খরচ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর সেবা দিতে পারলেই নতুন প্রতিষ্ঠানটি বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। বাংলালিংকের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে তাদের বড় গ্রাহকভিত্তিকে কীভাবে একটি কার্যকর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সফল হলে এর মাধ্যমে দেশের নগদনির্ভর লেনদেন কমানোর পাশাপাশি ডিজিটাল বাণিজ্যের পরিধিও আরও বাড়তে পারে।

