আইপিওর আগে এআই কোম্পানিটির বর্তমান আয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বড় ভবিষ্যৎ আয়কে মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন ব্যাংকার ও বিনিয়োগকারীরা
এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি ঘিরে বিনিয়োগকারীদের হিসাব এখন বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যৎকে ঘিরেই বেশি। কোম্পানিটির ২০২৮ সালের আয় প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, এমন পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য আইপিও মূল্যায়নের হিসাব করছেন ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকার ও বিনিয়োগকারীরা। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ্যানথ্রপিকের বর্তমান বার্ষিক আয়ধারার হার প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে আয়ে কয়েক গুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাকেই এখন কোম্পানিটির মূল্য নির্ধারণের বড় ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যানথ্রপিক নিজে ২০২৮ সালের ১৯০-২০০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস প্রকাশ করেনি। কোম্পানির আর্থিক তথ্য সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে এই তথ্য সামনে এসেছে। তবে আইপিওর প্রস্তুতি যে এগোচ্ছে, সেটি নিশ্চিত করেছে অ্যানথ্রপিক নিজেই। গত জুনে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) গোপনে এস-১ ফরমের খসড়া জমা দেওয়ার কথা জানায়। তখন কোম্পানি স্পষ্ট করে বলেছিল, শেয়ার বিক্রির সংখ্যা ও দাম এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আইপিওর সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
এখানে মূল বিষয়টি হলো, অ্যানথ্রপিকের মতো দ্রুত বেড়ে চলা এআই কোম্পানির মূল্যায়ন প্রচলিত পদ্ধতিতে করা কঠিন। সাধারণত প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ক্ষেত্রে লাভ, পরিচালন আয় বা ইবিআইটিডিএর মতো সূচক দেখে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অ্যানথ্রপিক এখনো এআই মডেল প্রশিক্ষণ, জিপিইউ, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং কর্মী নিয়োগে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ফলে বর্তমান লাভের চেয়ে ভবিষ্যতে কত বড় ব্যবসা তৈরি করতে পারবে, সেটিই বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই তারা ‘এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু-টু-রেভিনিউ’ বা কোম্পানির মূল্য বনাম আয়ের অনুপাত ব্যবহার করে সম্ভাব্য মূল্যায়ন করছেন।
অ্যানথ্রপিকের বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি দেখলে কেন বিনিয়োগকারীরা এত দূরের হিসাব করছেন, সেটি কিছুটা পরিষ্কার হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে কোম্পানিটির বার্ষিক আয়ধারার হার ছিল প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মে মাসে তা ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানেই আয়ধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে অ্যানথ্রপিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহ করে এবং কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়ায় ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির পেছনে খরচও কম নয়। এআই মডেল যত বেশি মানুষ ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করবে, সেগুলো চালাতে তত বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হবে। মডেল প্রশিক্ষণ, ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর তৈরি বা ‘ইনফারেন্স’, জিপিইউ এবং অন্যান্য অবকাঠামো সব ক্ষেত্রেই বিপুল ব্যয় হচ্ছে। অ্যানথ্রপিক নিজেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামলাতে অ্যামাজন, গুগল ও অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর চুক্তি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আসল হিসাব হলো, আয় যে গতিতে বাড়ছে, ভবিষ্যতে কি খরচ তার চেয়ে ধীরে বাড়বে? যদি তা হয়, তাহলে কোম্পানির মুনাফার মার্জিন দ্রুত বাড়তে পারে।
এই জায়গাতেই অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য মূল্যায়নের সঙ্গে অন্য উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তুলনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য আইপিও মূল্য নির্ধারণে ক্লাউডফ্লেয়ার, পালান্টির ও স্পেসএক্সকে তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকাররা বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পালান্টির দ্রুত বাড়তে থাকা সফটওয়্যার ও এআই ব্যবসার কারণে গুরুত্বপূর্ণ তুলনা তৈরি করছে। ক্লাউডফ্লেয়ার দেখাচ্ছে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সফটওয়্যার ও অবকাঠামো ব্যবসাকে বাজার কীভাবে মূল্যায়ন করে। আর স্পেসএক্সের ক্ষেত্রে বর্তমান আয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বিশাল ব্যবসার সম্ভাবনাও মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখছে।
অ্যানথ্রপিকের জন্য এই তুলনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, কোম্পানিটির ব্যবসা এখন শুধু সাধারণ চ্যাটবট ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ক্লড কোড’-এর মতো পণ্য সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে ব্যবহার বাড়াচ্ছে এবং বড় করপোরেট গ্রাহকেরাও অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি নিজেদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করছে। মে মাসে কোম্পানি জানিয়েছিল, ১ হাজারের বেশি ব্যবসায়িক গ্রাহক বছরে অন্তত ১০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ খরচ করছে। একই সময়ে অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড কোড’ ব্যবসার বার্ষিক আয়ধারাও ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল।
তবে ২০২৮ সালে ১৯০-২০০ বিলিয়ন ডলারের আয় হবে, এই পূর্বাভাসকে নিশ্চিত আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করা একটি অনুমান। এআই খাতে প্রযুক্তির পরিবর্তন খুব দ্রুত হচ্ছে, প্রতিযোগিতাও বাড়ছে, আর একই সঙ্গে কম্পিউটিং ব্যয় ও গ্রাহকদের মূল্য দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অ্যানথ্রপিকের বর্তমান প্রবৃদ্ধি যদি একই হারে না থাকে, কিংবা এআই পরিষেবা থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা তৈরি না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ আয়ের ভিত্তিতে করা উচ্চ মূল্যায়ন চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের আয় যতটা সুযোগের ইঙ্গিত দেয়, ততটাই বড় প্রত্যাশার ঝুঁকিও তৈরি করে।
সব মিলিয়ে অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও শুধু একটি প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশের ঘটনা নয়; এটি এআই ব্যবসার ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে। কোম্পানিটি ইতোমধ্যে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূল্যায়নে পৌঁছেছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগকারীরা কি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য বিশাল আয়কে আজকের দামে পুরোপুরি মূল্য দিতে প্রস্তুত? আর এআই থেকে যে বিপুল উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসায়িক আয় আসবে বলে বাজার আশা করছে, সেটি বাস্তবে কতটা তৈরি হবে, অ্যানথ্রপিকের আইপিও সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারে।

