টেসলার চালকবিহীন ট্যাক্সি সাইবারক্যাবে এবার যুক্ত হচ্ছে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট। শহরের মতো জায়গায় যেখানে সাধারণত মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে, সেখানে এমন প্রযুক্তি কেন প্রয়োজন, প্রশ্নটি স্বাভাবিক। তবে টেসলার পরিকল্পনাটি শুধু যাত্রীদের ইন্টারনেট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্বয়ংক্রিয় গাড়ির নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগই এর বড় কারণ।
১০ আগস্ট টেসলার রোবোট্যাক্সি অ্যাকাউন্টে প্রথম স্টারলিংক সংযুক্ত সাইবারক্যাবের ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবিতে গাড়ির ছাদে স্টারলিংকের অ্যান্টেনা দেখা যায়। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিকের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত আলোচনায় জানিয়েছিলেন, সাইবারক্যাবে স্টারলিংক যুক্ত করা হচ্ছে এবং যেসব বাজারে স্টারলিংক চালু আছে, ভবিষ্যতে টেসলার অন্যান্য গাড়িতেও এই প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শহরেও কেন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট?
প্রথম দেখায় বিষয়টি কিছুটা অস্বাভাবিক। কারণ সাইবারক্যাবের প্রাথমিক কার্যক্রম শহরকেন্দ্রিক, যেখানে ৪জি বা ৫জি নেটওয়ার্ক সাধারণত পাওয়া যায়। ফলে একটি গাড়িতে আলাদা করে স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা বসানোর প্রয়োজন কেন হবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। কিন্তু টেসলার যুক্তি হলো, রোবোট্যাক্সির জন্য শুধু ‘বেশির ভাগ সময়’ নেটওয়ার্ক থাকলেই হবে না, চলার পুরো পথে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ দরকার।
মাস্কের ভাষ্য অনুযায়ী, সিলিকন ভ্যালির মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রিক এলাকাতেও কিছু জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকে। মানুষের ব্যক্তিগত গাড়িতে কয়েক মিনিটের জন্য মোবাইল সংযোগ না থাকাটা বড় সমস্যা নাও হতে পারে। কিন্তু চালকবিহীন ট্যাক্সির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেটি গাড়ির পরিচালনা ও দূরবর্তী ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। মাস্ক তাই মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বল এলাকাগুলোকে রোবোট্যাক্সির জন্য এক ধরনের ‘ব্ল্যাক স্পট’ হিসেবে দেখছেন।
এখানেই স্টারলিংকের গুরুত্ব। মাটিতে বসানো মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভর না করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের সুযোগ থাকায় প্রত্যন্ত এলাকা, মহাসড়ক কিংবা দুর্বল সেলুলার নেটওয়ার্কের অঞ্চলও রোবোট্যাক্সির সম্ভাব্য চলাচলের আওতায় আনা যায়। অর্থাৎ টেসলার কাছে স্টারলিংক হয়তো মূল ইন্টারনেট সংযোগ নয়, বরং মোবাইল নেটওয়ার্কের একটি অতিরিক্ত স্তর বা ব্যাকআপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চালকবিহীন গাড়ির বহর বড় হলে এই নির্ভরযোগ্যতার মূল্য আরও বাড়তে পারে।
যাত্রীদের জন্যও আলাদা সুবিধা
স্টারলিংকের প্রয়োজন শুধু গাড়ি যাতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না করে, সেখানেই শেষ নয়। চালক না থাকায় যাত্রীরা পুরো সময়টাকে অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারবেন, সিনেমা দেখা, ভিডিও কল, অনলাইন কাজ কিংবা সরাসরি খেলা দেখা। মাস্ক বলেছেন, স্টারলিংকের মাধ্যমে গাড়িতে উচ্চমানের, এমনকি ৪কে লাইভ স্পোর্টসও দেখা সম্ভব হবে এবং প্রতি গিগাবাইট ডেটার খরচ সেলুলার নেটওয়ার্কের তুলনায় কম হতে পারে। টেসলার অর্থাৎ রোবোট্যাক্সির বড় স্ক্রিন ও যাত্রীকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার পরিকল্পনার সঙ্গেও এই উচ্চগতির সংযোগকে যুক্ত করা হচ্ছে।
এখানে আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। ইন্টারনেটে মানুষের পাশাপাশি এখন এআই বট ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারও বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান করছে। ক্লাউডফ্লেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে তাদের নেটওয়ার্কে বটের তৈরি ওয়েব রিকোয়েস্ট মানুষের তৈরি রিকোয়েস্টকে ছাড়িয়ে গেছে; জুলাইয়ের এক ঘোষণায় কোম্পানিটি জানিয়েছে, মোট ওয়েব রিকোয়েস্টের প্রায় ৫৭ শতাংশই স্বয়ংক্রিয় বট থেকে আসছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি, স্টারলিংককে কেবল এআইয়ের বাড়তি ব্যান্ডউইডথের ‘একমাত্র সমাধান’ হিসেবে দেখার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং মাস্কের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো টেসলা ভবিষ্যতের গাড়িকে শুধু চলাচলের মাধ্যম হিসেবে দেখছে না; গাড়িকে যোগাযোগ, বিনোদন, এআই এবং স্বয়ংক্রিয় পরিবহনের একটি সংযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তৈরি করতে চাইছে। সেই পরিকল্পনায় স্টারলিংক একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হতে পারে।
এর সঙ্গে টেসলা ও স্পেসএক্সের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে আসছে। দুই কোম্পানি এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। টেসলার জুলাইয়ের আয়-ব্যয় আলোচনায় মাস্ক বলেন, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে এবং ‘ওভারল্যাপ’ও বাড়ছে। তবে টেসলা ও স্পেসএক্স একীভূত হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। তাই সাইবারক্যাবে স্টারলিংক যুক্ত হওয়াকে সরাসরি সম্ভাব্য একীভূতকরণের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে সাইবারক্যাবে স্টারলিংক যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে শুধু ‘গাড়িতে ইন্টারনেট’ দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। টেসলা এমন একটি রোবোট্যাক্সি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাইছে, যেখানে গাড়ি নিজে চলবে, যাত্রীরা গাড়ির ভেতরে কাজ বা বিনোদন করবেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি সব সময় সংযুক্ত থাকবে। সেই লক্ষ্য পূরণে মোবাইল নেটওয়ার্কের পাশাপাশি স্যাটেলাইট সংযোগকে দ্বিতীয় স্তরের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনাই এখন বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। আর এ কারণেই শহরের রাস্তায় চলার কথা থাকা সাইবারক্যাবের ছাদেও জায়গা করে নিয়েছে মহাকাশ থেকে আসা ইন্টারনেট।

