বাংলাদেশের এমন অনেক এলাকা আছে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়া এখনো কঠিন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, উপকূল, নদী ও সমুদ্রঘেঁষা এলাকা কিংবা দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে প্রচলিত মোবাইল অবকাঠামো অনেক সময় নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এবার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি মোবাইল ফোনে সংযোগ দেওয়ার প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলালিংক।
মোবাইল অপারেটরটি বাণিজ্যিকভাবে এই সেবা চালুর জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের অনুমোদন চেয়েছে। শুরুতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খুদে বার্তা ও সীমিত পরিসরের তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে মহাকাশভিত্তিক আরেকটি সংযোগব্যবস্থা যুক্ত হবে। অর্থাৎ যেখানে মাটিতে মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা কঠিন বা কোনো কারণে টাওয়ারের সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, সেসব জায়গায় উপযুক্ত মোবাইল ফোন স্যাটেলাইটের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে।
বাংলালিংক ও স্পেসএক্স এর আগে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি মোবাইল ফোনে সংযোগ দেওয়ার প্রযুক্তি পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। গত এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠান দুটি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে ৬০ দিনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি চেয়েছিল।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত ও নিয়ন্ত্রক বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে বলে বাংলালিংক জানিয়েছে। এরপর গত ১২ আগস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিকভাবে এই সেবা চালুর অনুমোদন চায়।
এর আগে গত ২ ও ৩ আগস্ট কক্সবাজারে প্রযুক্তিটির মাঠপর্যায়ের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রদর্শনীতে স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগের মাধ্যমে খুদে বার্তা ও সীমিত তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগের বিস্তারিত নথি তৈরি, আইনসম্মত নজরদারি ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং অবস্থান শনাক্তকরণের মতো বিভিন্ন সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
অর্থাৎ এটি শুধু একটি প্রযুক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে এমন সেবা চালু করলে প্রযুক্তিগত ও আইনগতভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে, সেটিও পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর জন্য ব্যবহারকারীর কাছে আলাদা কোনো বড় যন্ত্র বা স্যাটেলাইট গ্রহণের ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন নেই। উপযুক্ত মোবাইল ফোন সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
প্রচলিত মোবাইল ব্যবস্থায় ফোন থেকে সংকেত প্রথমে নিকটবর্তী মোবাইল টাওয়ারে যায়। সেখান থেকে তা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছায়। কিন্তু স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি মোবাইল সংযোগের ক্ষেত্রে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট অনেকটা আকাশের মোবাইল টাওয়ারের মতো কাজ করে।
এ কারণে যেসব এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপন করা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ কিংবা ভৌগোলিকভাবে কঠিন, সেখানে এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এটিকে প্রচলিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। প্রচলিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা গ্রহণযন্ত্র বা নির্দিষ্ট সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। সরাসরি মোবাইল সংযোগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত মোবাইল ফোনই স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, সমুদ্রপথ, দ্বীপাঞ্চল, প্রত্যন্ত জনপদ এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সব সময় প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী রাখা সম্ভব হয় না।
জেলেরা এর অন্যতম সম্ভাব্য ব্যবহারকারী হতে পারেন। সমুদ্রের এমন এলাকায় প্রবেশের পর, যেখানে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা দুর্বল হয়ে যায়, সেখানে স্যাটেলাইটভিত্তিক মোবাইল সংযোগ যোগাযোগের বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।
একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে মোবাইল টাওয়ার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও তন্তুভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মোবাইল যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন স্যাটেলাইটভিত্তিক অতিরিক্ত সংযোগব্যবস্থা জরুরি যোগাযোগ সচল রাখার একটি বিকল্প মাধ্যম হতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তি চালু হলেই প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বিকল্প তৈরি হয়ে যাবে—এমনটা নয়। বাংলালিংকের প্রস্তাব অনুযায়ী শুরুতে খুদে বার্তা এবং সীমিত পরিসরের তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তিটির প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে এমন জায়গায় ন্যূনতম যোগাযোগ নিশ্চিত করা, যেখানে প্রচলিত নেটওয়ার্ক নেই বা নির্ভরযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেবার পরিধিও বাড়তে পারে।
এখানে মূল বিষয় হলো, স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগকে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা। একটি দেশে বিস্তৃত মোবাইল অবকাঠামো থাকার পরও এমন কিছু এলাকা থেকে যায়, যেখানে স্থলভিত্তিক অবকাঠামো পৌঁছে দেওয়া কঠিন। সেসব জায়গায় স্যাটেলাইট সংযোগ ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সম্ভাবনা জরুরি যোগাযোগে।
কোনো বড় দুর্যোগের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্যোগের আঘাতে মোবাইল টাওয়ার বা তন্তুভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকেও যোগাযোগ সমস্যায় পড়তে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে আকাশভিত্তিক একটি অতিরিক্ত যোগাযোগব্যবস্থা থাকলে তা জরুরি বার্তা পাঠানো এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে তাই এই প্রযুক্তির মূল্য শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো সম্ভাবনাটি ধরা পড়বে না। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তি চালুর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসবে। বাণিজ্যিকভাবে সেবা চালুর আগে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা, আইনসম্মত নজরদারি, অবস্থান শনাক্তকরণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলালিংকের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিটি শুধু যোগাযোগ সুবিধা বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার বিষয়ও সমানভাবে জড়িত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন কোন মোবাইল ফোন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে এবং সাধারণ গ্রাহকের জন্য এর ব্যয় কত হবে। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, তা যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে এর সামাজিক সুফল সীমিত হয়ে যাবে।
বাংলালিংকের আবেদন অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এতদিন মোবাইল সংযোগের বিস্তার মূলত স্থলভিত্তিক টাওয়ার ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্যাটেলাইটভিত্তিক সরাসরি সংযোগ সেই কাঠামোর সঙ্গে নতুন একটি স্তর যুক্ত করবে।
বাংলালিংকের প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক কর্মকর্তা তৈমুর রহমান বলেছেন, দুর্গম ও কঠিন এলাকায় প্রচলিত অবকাঠামো স্থাপন করা যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে এই প্রযুক্তি যোগাযোগ বাড়াতে পারে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হওয়ায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে সেবা চালুর প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদও সম্প্রতি বলেছেন, গ্রাহকদের উন্নত টেলিযোগাযোগ সেবা দিতে স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবাসহ নতুন প্রযুক্তির সুযোগ দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি মোবাইল ফোনে সংযোগের উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি মোবাইল সেবা হিসেবে দেখার চেয়ে বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি সম্ভাব্য নতুন দিক হিসেবে দেখা যায়। এর সাফল্য নির্ভর করবে অনুমোদন, প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, গ্রাহক ব্যয়, নিরাপত্তা এবং প্রচলিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।
যদি এসব চ্যালেঞ্জ সামলানো যায়, তাহলে যে মানুষটি আজ নেটওয়ার্কের বাইরে, আগামী দিনে তার হাতের সাধারণ মোবাইল ফোনই হয়তো আকাশের একটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খুলে দিতে পারে।

