বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রথম স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোয়ালিটি অব সার্ভিস বা সেবার মানসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুই প্রধান বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে রবি আজিয়াটা।
২০২৬ সালের জুলাই মাসের নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্স নিয়ে তৈরি বিটিআরসির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিন বেসরকারি অপারেটরের মধ্যে রবির ৪জি গড় ডাউনলোড গতি, ২জি কল সেটআপ সাফল্যের হার, ৪জি ডাটা সেশন ধরে রাখার সক্ষমতা, ভিওএলটিই কল সেটআপ সাফল্য, ভিওএলটিই ও জিএসএম মিলিয়ে ভয়েস কল সেটআপ সাফল্য এবং এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হার সবচেয়ে কম।
প্রতিবেদনটির গুরুত্বও রয়েছে আলাদা কারণে। এবারই প্রথম অপারেটরদের দেওয়া কোয়ালিটি অব সার্ভিসের তথ্য বিটিআরসি নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মিলিয়ে, পর্যালোচনা ও যাচাই করেছে। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও নেটওয়ার্কের মান পরিমাপ করা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে রবির ২জি কল সেটআপ সাফল্যের হার ছিল ৯৯ দশমিক ২৮৭৭ শতাংশ। একই সূচকে গ্রামীণফোনের হার ৯৯ দশমিক ৬৩২৩ শতাংশ এবং বাংলালিংকের ৯৯ দশমিক ৭২৭০ শতাংশ।
৪জি নেটওয়ার্কে রবির গড় ডাউনলোড গতি ছিল ৬ দশমিক ৮৪৭৭ এমবিপিএস। গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে এই গতি ৮ দশমিক ২২৬৪ এমবিপিএস এবং বাংলালিংকের ৮ দশমিক ৬০৭০ এমবিপিএস। অর্থাৎ এই সূচকেও তিন বেসরকারি অপারেটরের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল রবি।
৪জি ডাটা সেশন ধরে রাখার ক্ষেত্রেও রবির পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিটিআরসির হিসাবে, রবির ডাটা সেশন নন-রিটেইনেবিলিটি হার ছিল শূন্য দশমিক ২৪৬২ শতাংশ। গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে তা শূন্য দশমিক ১৪২৩ শতাংশ এবং বাংলালিংকের শূন্য দশমিক ০৯১১ শতাংশ। এই সূচকে হার যত কম, পারফরম্যান্স তত ভালো হওয়ায় রবির অবস্থান ছিল সবচেয়ে দুর্বল।
ভিওএলটিই কল সেটআপ সাফল্যের হারেও পিছিয়ে রয়েছে রবি। অপারেটরটির হার ছিল ৯৯ দশমিক ৬৫৪৯ শতাংশ। গ্রামীণফোনের ৯৯ দশমিক ৭৩২০ শতাংশ এবং বাংলালিংকের ৯৯ দশমিক ৯২০৮ শতাংশ।
ভিওএলটিই ও জিএসএম—দুই ধরনের ভয়েস কল একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে রবির কল সেটআপ সাফল্যের হার দাঁড়ায় ৯৯ দশমিক ৫৯৬৪ শতাংশ। একই সূচকে গ্রামীণফোনের হার ৯৯ দশমিক ৬৬৬৯ শতাংশ এবং বাংলালিংকের ৯৯ দশমিক ৭৬২৫ শতাংশ।
এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হারেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। রবির হার ছিল ৯৮ দশমিক ৭৪৯৫ শতাংশ। এর বিপরীতে গ্রামীণফোনের ৯৯ দশমিক ৬২১১ শতাংশ এবং বাংলালিংকের ৯৯ দশমিক ৮০৮৬ শতাংশ।
তবে সব সূচকেই রবি দুর্বল—এমন চিত্রও পাওয়া যায়নি। কিছু ভয়েস ও নেটওয়ার্ক সূচকে বরং অন্য দুই অপারেটরের চেয়ে ভালো করেছে রবি।
২জি কল ড্রপের হার রবির সবচেয়ে কম ছিল, যা শূন্য দশমিক ২৪০৫ শতাংশ। গ্রামীণফোনের হার শূন্য দশমিক ৩২৯৮ শতাংশ এবং বাংলালিংকের শূন্য দশমিক ৩৫৬৬ শতাংশ। ৪জি আরআরসি সাফল্যের হারেও রবি সবচেয়ে এগিয়ে ছিল, যার পরিমাণ ৯৯ দশমিক ৮৬৯৫ শতাংশ।
ভিওএলটিই কল ড্রপের ক্ষেত্রে রবির হার ছিল শূন্য দশমিক ১৩৪৮ শতাংশ। এই সূচকে গ্রামীণফোনের হার শূন্য দশমিক ৩৮১৪ শতাংশ হওয়ায় রবির পারফরম্যান্স ভালো ছিল। তবে বাংলালিংকের হার ছিল আরও কম, শূন্য দশমিক ০৭৩২ শতাংশ।
ভিওএলটিই ও জিএসএম কল একসঙ্গে বিবেচনা করলে অস্বাভাবিকভাবে কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার হারও রবির সবচেয়ে কম ছিল—শূন্য দশমিক ২১১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, সিএসএফবি সাফল্যের হার রবির ছিল ৯৮ দশমিক ৮৯৪২ শতাংশ। গ্রামীণফোনের ৯৮ দশমিক ৬৪৫৩ শতাংশের চেয়ে এটি বেশি হলেও বাংলালিংকের ৯৯ দশমিক ১৮৫৬ শতাংশের চেয়ে কম।
জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সূচকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে বাংলালিংক। ৪জি ডাউনলোড গতি, ২জি কল সেটআপ সাফল্য, ৪জি ডাটা সেশন ধরে রাখার সক্ষমতা, ভিওএলটিই কল সেটআপ সাফল্য, ভিওএলটিই অস্বাভাবিক কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার হার এবং এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হারে অপারেটরটি সবার ওপরে ছিল।
বাংলালিংকের ৪জি ডাউনলোড গতি ছিল ৮ দশমিক ৬০৭০ এমবিপিএস। ২জি কল সেটআপ সাফল্যের হার ৯৯ দশমিক ৭২৭০ শতাংশ এবং ৪জি ডাটা সেশন নন-রিটেইনেবিলিটি ছিল শূন্য দশমিক ০৯১১ শতাংশ। ভিওএলটিই কল সেটআপ সাফল্য ছিল ৯৯ দশমিক ৯২০৮ শতাংশ এবং এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হার ৯৯ দশমিক ৮০৮৬ শতাংশ।
সিএসএফবি সাফল্যের হারেও ৯৯ দশমিক ১৮৫৬ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে ছিল বাংলালিংক। জাতীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা ৬৪টি পরীক্ষাকেন্দ্রের সবগুলোতেই প্রাসঙ্গিক কেপিআই পূরণ করেছে অপারেটরটি। জেলা পর্যায়েও তালিকাভুক্ত সূচকগুলোর ক্ষেত্রে ৫৩৮টির মধ্যে ৫৩৮টি পর্যবেক্ষণেই নির্ধারিত মান পূরণ করেছে বাংলালিংক।
গ্রামীণফোনের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। অপারেটরটির গড় ৪জি ডাউনলোড গতি ছিল ৮ দশমিক ২২৬৪ এমবিপিএস এবং ২জি কল সেটআপ সাফল্যের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৬৩২৩ শতাংশ। ৪জি আরআরসি সাফল্যের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮৩৪৫ শতাংশ।
তবে ভিওএলটিই অস্বাভাবিক কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার হারে গ্রামীণফোনের অবস্থান ছিল সবচেয়ে খারাপ। এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৩৮১৪ শতাংশ। ভিওএলটিই ও জিএসএম মিলিয়ে অস্বাভাবিক কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার হারও ছিল শূন্য দশমিক ৩৪৭৮ শতাংশ, যা রবি ও বাংলালিংক—দুই অপারেটরের চেয়ে বেশি।
তবে সামগ্রিক পারফরম্যান্সে পার্থক্য থাকলেও বিটিআরসির পর্যবেক্ষণে তিনটি বেসরকারি অপারেটরই তালিকাভুক্ত জাতীয় পর্যায়ের কেপিআইয়ের নির্ধারিত সীমা পূরণ করেছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৪জি নেটওয়ার্কের পারফরম্যান্সে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে।
টেলিটক জাতীয় পর্যায়ে ৪জি গড় ডাউনলোড গতি ১১ দশমিক ২ এমবিপিএস বলে জানিয়েছিল, যা তিন বেসরকারি অপারেটরের ঘোষিত গতির চেয়ে বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত কাঁচা বা বাইনারি ফাইল না থাকায় বিটিআরসি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ফলে টেলিটকের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ক্ষেত্রে যাচাইকৃত পর্যবেক্ষণমূলক ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

