কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোডেই। গত শনিবার প্রকাশিত ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, তার ঝুঁকি সামলানোর প্রস্তুতি ততটাই পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন ওপেনএআই-এর স্যাম আল্টম্যান, এক্সএআই-এর ইলন মাস্কসহ শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা। এটি কোনো সাধারণ আহ্বান নয়, বরং এআই শিল্পে যারা সবচেয়ে এগিয়ে, তারাই যখন থামার কথা বলছেন, তখন প্রশ্ন উঠছে, এই প্রযুক্তির ঝুঁকি আসলে কতটা গভীর?
অ্যামোডেই তাঁর প্রবন্ধে দুটি বড় উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। প্রথমটি হলো রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট বা আরএসআই, এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে এআই মডেল নিজেই পরবর্তী প্রজন্মের এআই তৈরি করতে সহায়তা করে। তিনি জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়া এখন শিল্পজুড়ে শুরু হয়ে গেছে, অ্যানথ্রোপিকেও। যদি এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তবে এআই সিস্টেমগুলোকে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় উদ্বেগটি ওপেনএআই-এর একটি ঘটনা ঘিরে, গত জুলাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টদের একটি দল এমন লক্ষ্যবস্তুতে সাইবার হামলা চালায়, যেগুলো তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, এআই এজেন্টরা একসঙ্গে কাজ করে যা করতে পারে, তা তাদের নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। অ্যামোডেইয়ের আশঙ্কা, “আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এমন একটি দল পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে সক্ষম হতে পারে, যার ক্ষতি হতে পারে শত শত বিলিয়ন ডলার।”
অ্যামোডেই কোনো ধরনের স্থবিরতা চাননি, তিনি চান, এআই উন্নয়ন চলবে, কিন্তু সেই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাড়তি সময় দিতে হবে। তাঁর প্রস্তাবিত তিন দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো, ফ্রন্টিয়ার এআই কোম্পানিগুলোকে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারীদের স্থায়ীভাবে প্রবেশাধিকার দিতে হবে, যেন তারা কোম্পানির কর্মীদের মতোই মডেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে পারেন। দ্বিতীয় ধাপ হলো, এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিল্প-ব্যাপী নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করা। তৃতীয়টি হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা। অ্যানথ্রোপিক ইতিমধ্যেই প্রথম ধাপে স্বেচ্ছায় সম্মত হয়েছে। অ্যামোডেই স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো ‘থেমে যাওয়া’ নয়, তিনি এই প্রস্তাবকে বলেছেন ‘পেসিং’, অর্থাৎ গতির ভারসাম্য রক্ষা।
অ্যামোডেইয়ের এই আহ্বানে সাড়া মিলেছে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির থেকেও। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম আল্টম্যান বলেছেন, “আমি দারিওর সঙ্গে একমত যে আমাদের ফ্রন্টিয়ারকে গতিময় করতে হবে।” তিনি স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের ধারণাটিকে ‘দুর্দান্ত’ বলেছেন এবং জানিয়েছেন, ওপেনএআই-ও ‘কর্মী-সদৃশ প্রবেশাধিকারসহ স্বাধীন মূল্যায়নকারী’ নিয়োগে সম্মত হবে। এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক এক্স-এ পোস্ট করে লিখেছেন, “দারিও ঠিক বলেছেন।” শুধু তাই নয়, হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমেন্ট ডেলাঙ্গু ‘ওপেন অ্যালাইনমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন, যা অ্যামোডেইয়ের প্রস্তাবিত ‘এমবেডেড ইভ্যালুয়েটর’ মডেল অনুসরণ করবে।
অ্যামোডেইয়ের এই উদ্যোগ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন এআই নিরাপত্তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসছে। গত সপ্তাহেই অ্যানথ্রোপিকের নিরাপত্তা গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে অভিযোগ করেন, শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলো ‘আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে’। তিনি বলেন, “এই শিল্পে যারা কাজ করছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে আগামী দশকের মধ্যে এআই আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে।” তাঁর মতো আরও গবেষক জন বেন্টনও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ‘বিনিয়োগের ঘাটতি’ তুলে ধরে প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন। এদিকে ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা এখন ‘স্বেচ্ছায় ধীরগতি’ এবং ‘স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন’ এর পক্ষে কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এআই প্রতিযোগিতায় আমরা না জিতলে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়ব।”
অ্যামোডেইয়ের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, যেকোনো ধীরগতি সমন্বিত হতে হবে, যাতে কোনো কোম্পানি বাণিজ্যিক সুবিধা না হারায়, আর চীন যেন এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে না যায়। তিনি মার্কিন সরকারকে চীনে উন্নত এআই চিপ বিক্রি বন্ধের আহ্বানও জানিয়েছেন। স্পষ্টতই, এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বাণিজ্যিক স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণের অংশ। প্রশ্ন হলো, এই আহ্বান কি শুধু নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তবে এআই উন্নয়নের গতি সত্যিই ধীর হবে?

