ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা নিখুঁত হিসাব ও কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে স্যাটেলাইটটিকে নিরাপদ রাখেন। বিশেষ বিষয় হলো, পুরো কাজটি তাঁরা নিজেরাই করেছেন, স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কোনো সহায়তা ছাড়াই।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গত ১৩ আগস্ট ওই ধ্বংসাবশেষ বিএস-১-এর ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। মহাকাশের হিসাবে এই দূরত্ব বেশ কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়। সংঘর্ষ হলে স্যাটেলাইটটির বড় ক্ষতি হতে পারত।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ৯ আগস্টের দিকে বিএসসিএলের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম স্পেস-ট্র্যাকের কাছ থেকে একটি সতর্কবার্তা পায়। বিএসসিএল স্পেস-ট্র্যাকের সদস্য হওয়ায় কোনো ধ্বংসাবশেষ স্যাটেলাইটের জন্য হুমকি হয়ে উঠলে তারা এ ধরনের তথ্য পেয়ে থাকে। ইমাদুর রহমান বলেন, মহাকাশে সব সময়ই কিছু বর্জ্য বা ধ্বংসাবশেষ ভেসে বেড়ায়।
বিএসসিএলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএস-১-এর দিকে ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষটি ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট ইনস্যাট-১এ-এর অংশ। ১৯৮২ সালে উৎক্ষেপণের পর স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। এর পর থেকে সেটি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় মহাকাশে ভাসছে।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই গাজীপুর কন্ট্রোল সেন্টারের প্রকৌশলীরা কাজে নেমে পড়েন। তাঁরা স্যাটেলাইটের বর্তমান অবস্থান, ধ্বংসাবশেষের গতিপথ এবং সংঘর্ষের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ শুরু করেন। ইমাদুর রহমানের ভাষ্য, এই কাজে ভুল করার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ সামান্য হিসাবের ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত।
ধ্বংসাবশেষ ঠিক কখন এবং কতটা কাছে আসবে, তা স্পষ্ট হতে থাকলে প্রকৌশলীরা স্পেস-ট্র্যাকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয় যে সংঘর্ষ এড়াতে বিএস-১-কে তার কক্ষপথ থেকে সামান্য সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইমাদুর রহমান জানান, স্যাটেলাইটটিকে বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে অন্য অবস্থানে নেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
১৩ আগস্ট ধ্বংসাবশেষটি স্যাটেলাইটের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়। তখন সেটি বিএস-১ থেকে মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করে যায়। কক্ষপথ সামান্য সরানোর কৌশলের কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ হয়নি।
পুরো বিষয়টি বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাই সামলেছেন। স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছে ফরাসি প্রতিষ্ঠান থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। কিন্তু এবার সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো সাহায্য নেওয়া হয়নি। ইমাদুর রহমান বলেন, যারা স্যাটেলাইটটি বানিয়েছে, তাদের কোনো সহায়তা তাঁরা নেননি। তাঁদের প্রকৌশলীরাই পুরো কাজ সফলভাবে শেষ করেছেন।
বিএস-১ উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালের মে মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে। উৎক্ষেপণের পর প্রথম তিন বছর এর পরিচালনায় থালেসের প্রকৌশলীরা সহায়তা করেছেন। তবে ২০২১ সাল থেকে স্যাটেলাইটটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিএসসিএল নিজেদের হাতে নেয়। ইমাদুর রহমান জানান, ২০২৪ সাল পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন বিএসসিএল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই স্যাটেলাইটের সব কার্যক্রম চালাচ্ছে। বর্তমানে গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই প্রকৌশলীরা এটি নিয়ন্ত্রণ করেন।
এটিই প্রথমবার নয় যে বিএস-১ মহাকাশ বর্জ্যের সম্ভাব্য সংঘর্ষের মুখে পড়ল। ইমাদুর রহমান জানান, ২০২১ সালেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। সাধারণত কোনো স্যাটেলাইটের কাছাকাছি ধ্বংসাবশেষ চলে এলে মহাকাশে নজরদারি করা বিভিন্ন সংস্থা সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে।
ঘটনাটি দেশের মহাকাশ প্রযুক্তির সক্ষমতার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর চেয়ে সেটিকে বছরের পর বছর নিরাপদে পরিচালনা করা কম চ্যালেঞ্জের নয়। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মহাকাশ বর্জ্যের এই সময়ে সংঘর্ষের ঝুঁকি সামলানো স্যাটেলাইট পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নিজস্ব প্রকৌশলীদের দিয়ে এমন সংকট সামলানোয় বিএসসিএলের দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার প্রমাণ মিলেছে।

