ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকায় নিযুক্ত রুশ দূতাবাসের বরাতে জানানো হয়েছে, পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো স্বনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা ‘নিউক্লিয়ার চেইন রিয়্যাকশন’ সফলভাবে শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষায় এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে বলা হয় রিঅ্যাক্টরের ‘মিনিমাম কন্ট্রোল লেভেল’ বা সর্বনিম্ন নিয়ন্ত্রণ স্তর অর্জন। এর মাধ্যমে পরমাণু শক্তি থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কড়া তদারকিতে কারিগরি নিরাপত্তা বজায় রেখে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর বিশেষজ্ঞ দল সফলভাবে এই পরীক্ষা সম্পন্ন করে।
সাধারণ পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে বলতে গেলে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আলো বা বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই চেইন রিয়্যাকশন হলো প্রথম এবং মূল চালিকাশক্তি। ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ভেঙে বা ফিশন ঘটিয়ে যে তীব্র তাপশক্তি তৈরি হয়, তা দিয়ে প্রথমে পানি ফুটিয়ে বাস্প বা স্টীম তৈরি করা হয়। সেই বাষ্পের ধাক্কায় মেকানিক্যাল এনার্জি বা যান্ত্রিক শক্তি হিসেবে টারবাইন ঘোরে এবং জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি ধাপে বিভক্ত, যার মধ্যে প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপটিই হলো এই নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া চালু করা।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোভিত্তিক রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এই সফলতাকে পুরো প্রজেক্টের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটটিকে বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষমতার স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের নভেম্বর মাসের শেষ নাগাদ প্রথম ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। রাশিয়ান ও স্থানীয় প্রকৌশলীদের যৌথ উপস্থিতিতে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোড করার সব কারিগরি প্রক্রিয়া আগে থেকেই সম্পন্ন করা হয়েছিল, যা থেকে বর্তমানে পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় রেখে বাণিজ্যিকভাবে হিট জেনারেশন শুরু করা হচ্ছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে দুই ইউনিট বিশিষ্ট এই মেগা প্রকল্পে রাশিয়ার আধুনিক ভিভিইআর ১২০০ মেগাওয়াটের দুটি চাপযুক্ত পানি চালিত রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। কেন্দ্রটির সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং সাশ্রয়ী খরচে পরিবেশবান্ধব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই পারমাণবিক কেন্দ্র রূপান্তরকামী ভূমিকা পালন করবে। কারিগরি দলগুলো এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শেষ মুহূর্তের টেস্টিং কাজ পরিচালনা করছে, যাতে জাতীয় গ্রিডে সফল ও নিরাপদভাবে পরমাণু বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।

