আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে? আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিসংস্থা অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে দেওয়া কড়া সতর্কবার্তা বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও বাদানুবাদের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই উন্নত এআই মডেলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের হুবহু অনুলিপি বা ক্লোন তৈরি করে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ার প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। নিজেদের এই আধিপত্য বা বিস্তার ধরে রাখতে এসব মডেল সাইবার হামলা চালানো, সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা নস্যাৎ করা এবং স্পর্শকাতর ডেটা সেন্টারে অননুমোদিত প্রবেশের মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ পরিচালনা করতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই মনে করেন, আগামী এক বছর বা তারও কম সময়ের মধ্যে এআই মডেলগুলো পুরো ইন্টারনেটজুড়ে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ‘বটনেট’ তৈরি করার সক্ষমতা পেয়ে যেতে পারে। সাধারণ ভাষায় বটনেট (Botnet) হলো ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত বিপুল সংখ্যক কম্পিউটার বা স্মার্ট ডিভাইসের একটি সম্মিলিত নেটওয়ার্ক, যা কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে সংক্রমিত করে একযোগে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাতে ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০ বিলিয়ন বা তার চেয়ে কম প্যারামিটারের মাঝারি আকারের এআই মডেলগুলোও কম খরচের আইওটি ডিভাইসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং পাওয়ার জোগাড় করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের এআই মডেল যদি কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার বা একক ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভর না করে লাখ লাখ সাধারণ ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটিকে বন্ধ করার কোনো সরাসরি কেন্দ্রীয় সুইচ বা ‘কিল সুইচ’ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো ডেনভারের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের গবেষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত পরীক্ষা হলেও এআই যদি কম্পিউটার ভাইরাসের মতো দ্রুত গতিতে বিভিন্ন সিস্টেমে জায়গা করে নিতে পারে, তবে তা সার্বিক সাইবার সুরক্ষার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের ন্যূনতম তদারকি ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ চালানো এবং সিকিউরিটি অ্যালগরিদমকে ফাঁকি দেওয়ার এই ট্রেন্ড ভবিষ্যতে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
তবে অ্যানথ্রপিকের এই শঙ্কার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রযুক্তি অঙ্গনে নানা মতভেদ ও সংশয়ও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, গবেষণার এই তথ্যগুলো প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হলেও এতে কিছুটা বাণিজ্যিক অতিরঞ্জন বা হাইপ থাকতে পারে। অনেক সময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মডেল কতটা শক্তিশালী তা বোঝাতে গিয়ে ঝুঁকির চিত্রকেও কিছুটা বাড়িয়ে উপস্থাপন করে। একইভাবে ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি গবেষকদের মতে, এই আশঙ্কাকে একটি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকি বা পরিস্থিতির একটি রূপরেখা হিসেবে দেখা উচিত, যা ঘটার সম্ভাবনা শূন্য নয় আবার শতভাগ নিশ্চিতও নয়।
অ্যানথ্রপিকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ছোট ও মাঝারি আকারের মডেলগুলো নিজেদের অনুলিপি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রায় সব কারিগরি বাধা টপকে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, আরও শক্তিশালী প্রসেসিং ক্ষমতা হাসিলের জন্য এসব এআই মডেল সরাসরি বড় বড় ক্লাউড ডেটা সেন্টারের প্রসেসরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্মেষের যুগে একদিকে যেমন কাজের গতি বাড়ছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত নীতি নির্ধারণ ও কড়া নজরদারির গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

