বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কম্পিউটার সেবা রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮.৬৮ শতাংশ বেড়ে ৬৮৪.১৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রচলিত প্রযুক্তিসেবা ও বিদেশি কাজের বাজারকে সংকুচিত করতে পারে।
যেসব কাজের জন্য উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে কর্মী ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে, সেসব কাজের কিছু অংশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে শুধু রপ্তানি আয় বাড়ানো নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কম্পিউটার সফটওয়্যার রপ্তানি ৮.৮২ শতাংশ বেড়ে ৪৮.৩৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৪৪.৪৬ মিলিয়ন ডলার। তবে সফটওয়্যার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ মিলিয়ন ডলার, যার তুলনায় অর্জন ১২.০৪ শতাংশ কম।
ড্রিম৭১ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাশাদ কবিরের মতে, রপ্তানি আয়ের এই বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। তাঁর আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রইসুল কবিরও মনে করেন, বিদেশি বাজারে চাহিদার ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে কোনো প্রতিষ্ঠান পাঁচজন বাইরের সফটওয়্যার প্রকৌশলী নিয়োগ করলেও এখন একই ধরনের কাজের জন্য তিনজন প্রয়োজন হতে পারে। এতে প্রচলিত কর্মী সরবরাহভিত্তিক ব্যবসার ওপর চাপ বাড়ছে।
অন্যদিকে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার মধ্যে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বহির্সংস্থান এবং তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনাসেবা থেকে আয় হয়েছে ৬০৪.৯৭ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের ৫৪৩.৬৬ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই আয় ১১.২৮ শতাংশ বেশি। তবে ৭০৫ মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ব্যয় কমিয়ে দিলেও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। ফলে মান নিয়ন্ত্রণ, জটিল কাজ সম্পাদন, নির্ভরযোগ্যতা এবং গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখার গুরুত্ব বাড়ছে।
ঢাকাভিত্তিক একটি কনটেন্ট প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবসায়িক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কাউসার আহমেদ নিরব জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা একসময় ৬০০ ছাড়ালেও বর্তমানে তা ৪০০-এর নিচে নেমেছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহায়ক কর্মপদ্ধতিতে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যবসার পরিসর বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি সাইবার নিরাপত্তা খাতেও প্রবেশ করেছে এবং নতুন একটি ভার্চুয়াল পোশাক পরিধান-পরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির সব খাতে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। কম্পিউটার পরামর্শসেবা রপ্তানি ২৮.৬৬ শতাংশ কমে ২৫.১৯ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। কম্পিউটার স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতসেবা থেকে আয়ও ৭.৭২ শতাংশ কমে ৫.৬২ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবিরের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি স্বাগত জানানোর মতো হলেও দীর্ঘদিনের ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বর্তমান গতি যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে, দ্বিমাত্রিক গ্রাফিকসের মতো কিছু প্রচলিত কাজের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে হবে, উচ্চমূল্যের কাজের দিকে যেতে হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ ও নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনও জরুরি।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি আয় বাড়লেও ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত নিজেদের দক্ষতা, সেবার ধরন ও ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তন করতে পারে তার ওপর। শুধু কম খরচে কাজ সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হতে পারে। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উন্নতমানের, জটিল ও বিশেষায়িত সেবা দিতে পারাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

