ফেসবুকে একটি পোশাকের ছবি দিয়ে পোস্ট করার পর থেকেই শুরু হয় অনলাইন উদ্যোক্তার ব্যস্ততা। কেউ জানতে চান পণ্যটির অন্য রং আছে কি না, কেউ দাম জানতে চান, আবার কেউ অর্ডার করে ডেলিভারির খোঁজ নেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেক সময় উদ্যোক্তাকে নিজের মূল ব্যবসার কাজই সরিয়ে রাখতে হয়। বিশেষ করে যেসব ছোট ব্যবসায় আলাদা কাস্টমার সার্ভিস কর্মী রাখার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এটি বড় চাপ। এই কাজের একটি বড় অংশ এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে সামলানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে তৈরি ফাস্টকম এআই নামের একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম শুধু গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তরই নয়, অর্ডার যাচাই, পণ্যের মজুদ দেখা এবং ডেলিভারির তথ্য জানানোর মতো কাজও করতে পারে।
ঢাকাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এসেন্ড এআই এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। তাদের লক্ষ্য ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ওয়েবসাইটের চ্যাট ও ইমেইলের মতো যোগাযোগমাধ্যমকে একটি ব্যবসার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। ফলে একজন গ্রাহক যে মাধ্যমেই যোগাযোগ করুন, ব্যবসার পণ্যের তথ্য, অর্ডার ও প্রয়োজনীয় সেবা সম্পর্কে দ্রুত উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এটি ফেসবুকের নিজস্ব কোনো নতুন ফিচার নয়। বরং ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে এমন একটি আলাদা প্রযুক্তি।
এত দিন অনলাইন ব্যবসায় চ্যাটবটের ব্যবহার মূলত কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন পণ্যের দাম কত, দোকান কখন খোলা থাকে, ডেলিভারি চার্জ কত কিংবা পণ্য ফেরত দেওয়ার নিয়ম কী। এসব প্রশ্নের জন্য আগে থেকে উত্তর নির্ধারণ করে রাখলেই চ্যাটবট কাজ করতে পারে। কিন্তু গ্রাহক যখন এমন কিছু জানতে চান, যার জন্য ব্যবসার নিজস্ব তথ্যভান্ডার বা অর্ডার ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে হয়, তখন সাধারণ চ্যাটবট অনেক সময় কাজ করতে পারে না।
এআই এজেন্টের পার্থক্য এখানেই। এটি শুধু কথোপকথন চালায় না, নির্দিষ্ট অনুমতি থাকলে প্রয়োজনীয় কাজও করতে পারে। ধরুন, একজন ক্রেতা জানতে চাইলেন তাঁর অর্ডার কোথায় আছে। সাধারণ চ্যাটবট হয়তো জানাবে, অর্ডারের তথ্য জানতে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু ব্যবসার অর্ডার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এআই এজেন্ট অর্ডার নম্বর খুঁজে ডেলিভারির বর্তমান অবস্থা জানাতে পারে। আবার অনুমতি থাকলে অভিযোগ নথিভুক্ত করা, ফেরত দেওয়ার আবেদন তৈরি করা কিংবা অর্ডার বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে।
সহজভাবে বললে, চ্যাটবট প্রশ্নের উত্তর দেয়, আর এআই এজেন্ট প্রয়োজন বুঝে পরবর্তী কাজটিও এগিয়ে নিতে পারে। অবশ্য কোন কাজটি সে নিজে করতে পারবে, আর কোন ক্ষেত্রে মানুষের অনুমতি লাগবে, সেটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই নির্ধারণ করে দেবে।
বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ক্রেতারা সব সময় একই ভাষায় বা একই ধরনের বাক্যে কথা বলেন না। কেউ লেখেন, ‘ভাই, প্রোডাক্টটা অ্যাভেইলেবল?’ আবার কেউ জানতে চান, ‘আজ অর্ডার দিলে কাল পাব?’ একই কথোপকথনে বাংলা, ইংরেজি ও বাংলিশের মিশ্রণ থাকে। অনেক সময় আঞ্চলিক ভাষাও ব্যবহার করেন ক্রেতারা।
এ ধরনের কথাবার্তা বুঝতে পারা এআইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্রেতার প্রশ্নের অর্থ ভুল বুঝলে পণ্যের ভুল তথ্য দেওয়া, অর্ডারে ভুল করা কিংবা ডেলিভারি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি থাকে। ফাস্টকম এআইয়ের দাবি, তাদের প্ল্যাটফর্ম বাংলা, বাংলিশ ও ইংরেজিতে কথোপকথন চালাতে পারে। গ্রাহক একই কথোপকথনে ভাষা পরিবর্তন করলেও আগের আলোচনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্ল্যাটফর্মটি শুধু ফেসবুক ইনবক্সেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যবসার কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম), অর্ডার ব্যবস্থাপনা, পণ্যের মজুদ এবং অন্যান্য তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে একজন ক্রেতা কোনো পণ্যের মজুদ জানতে চাইলে এআই শুধু আগে থেকে তৈরি উত্তর না দিয়ে ব্যবসার অনুমোদিত তথ্যভান্ডার থেকেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ব্যবসাগুলোতে ফাস্টকম এআইয়ের প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু এফ-কমার্স ব্যবসায় গ্রাহকের কথোপকথন ও সংশ্লিষ্ট অর্ডার ব্যবস্থাপনার প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত এআইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেগুলো মানব কর্মীদের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
একটি ব্যবসার উদাহরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগে কাস্টমার ব্যবস্থাপনার কাজে প্রায় ২০ জন কর্মী যুক্ত ছিলেন। এআই চালুর পর সাধারণ কথোপকথনের বেশির ভাগই প্রযুক্তিটি সামলাচ্ছে। বর্তমানে দুজন কর্মী মূলত জটিল অভিযোগ, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের কাজ দেখছেন। তবে বাকি কর্মীদের চাকরি চলে গেছে, নাকি তাঁদের অন্য কাজে যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখানে বিষয়টি শুধু কর্মীর সংখ্যা কমানোর হিসাব দিয়ে দেখা ঠিক হবে না। ছোট ব্যবসার জন্য সার্বক্ষণিক কাস্টমার সার্ভিস চালু রাখা ব্যয়বহুল। একজন উদ্যোক্তা রাতেও ক্রেতার বার্তার উত্তর দিতে না পারলে সেই ক্রেতা অন্য দোকানে চলে যেতে পারেন। এআই যদি রাতেও পণ্যের তথ্য দিতে পারে, অর্ডারের অবস্থা জানাতে পারে এবং প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে বিক্রির সুযোগ হারানোর ঝুঁকি কমতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি দাবি, কিছু ব্যবসায় আগে গ্রাহকের বার্তার উত্তর দিতে গড়ে আড়াই ঘণ্টা লাগত, এআই ব্যবহারের পর প্রাথমিক উত্তর দেওয়ার সময় কমে প্রায় ২৫ সেকেন্ড হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, পুরো এফ-কমার্স খাতের স্বাধীনভাবে যাচাই করা ফল নয়।
এআই ব্যবহারের সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও জড়িত। বিশেষ করে যেসব কাজে প্রতিদিন একই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, সেখানে মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে কাস্টমার সার্ভিসের সব কাজ এক রকম নয়। পণ্যের দাম জানানো বা অর্ডারের অবস্থা খুঁজে দেওয়ার মতো নিয়মিত কাজ এআই করতে পারলেও জটিল অভিযোগ, ক্রেতার বিশেষ অনুরোধ, দর-কষাকষি কিংবা ক্ষতিপূরণের মতো সিদ্ধান্তে মানুষের বিচারবুদ্ধি প্রয়োজন।
তাই ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার কর্মীদের পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে। একজন উদ্যোক্তা যদি প্রতিদিন একই প্রশ্নের উত্তর দিতে কয়েক ঘণ্টা ব্যয় না করেন, তাহলে সেই সময় পণ্যের মান উন্নয়ন, নতুন ক্রেতা খোঁজা, বিপণন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করতে পারেন।
তবে এআইকে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যবস্থায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ভুল তথ্য দিয়ে অর্ডার নিশ্চিত করা, অনুমতি ছাড়া অর্ডার বাতিল করা কিংবা গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ভুলভাবে ব্যবহার করার মতো ঘটনা ব্যবসার ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে কোন তথ্য এআই দেখতে পারবে, কোন কাজ নিজে করতে পারবে এবং কোন সিদ্ধান্তের আগে মানুষের অনুমতি নিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। ফাস্টকম এআইও জটিল বিষয় মানুষের কাছে পাঠানো এবং এআইয়ের কাজ পর্যালোচনার জন্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কথা জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ছোট অনলাইন ব্যবসার জন্য এআই নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তার পক্ষে আলাদা কাস্টমার সার্ভিস টিম রাখা সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য প্রযুক্তিটি সময় ও পরিচালন ব্যয় বাঁচানোর সুযোগ দিতে পারে। তবে এআই ব্যবহার করলেই বিক্রি বাড়বে বা কর্মী কমানোর প্রয়োজন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যবসার ধরন, পণ্যের তথ্যের সঠিকতা, প্রযুক্তির খরচ এবং গ্রাহকের আস্থার ওপর এর সুফল নির্ভর করবে। ফেসবুকের ইনবক্স যদি একটি অনলাইন দোকানের বিক্রয়কেন্দ্র হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই দোকানের প্রথম সারির সহকারী হিসেবে এআইয়ের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু ক্রেতার আস্থা ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

