কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর আশঙ্কা, আগামী সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের ফলে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে পুরোনো অনেক ধরনের কাজ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কাজ পুনরাবৃত্তিমূলক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও একই সময়ে প্রায় ৫০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, তবে সেই কাজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে দেশের তরুণরা কতটা প্রস্তুত—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রথাগত শিক্ষা যথেষ্ট হবে না। প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও বিপুলসংখ্যক তরুণ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে না।
শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখন আর শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই বড় বিষয় নয়, বরং শিক্ষার মান এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষায়, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে ভর্তি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা কী ধরনের দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি মনে করেন, শিক্ষা খাতে ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর হতে পারে। এ কারণে শিক্ষা আন্দোলনকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক হিসেবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, নতুন প্রজন্মের সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করে শিক্ষা সংস্কারে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। তাঁর মতে, শুধু নীতিগত আলোচনা নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, সরকার শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে বাজেট বরাদ্দ এবং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান বাড়বে না; শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক পাঠক্রম এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
উপবৃত্তিনির্ভর সহায়তা নিয়েও মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের শুধু উপবৃত্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ শিক্ষা ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবারগুলোর আরও অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ থাকে, যা শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সংলাপে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশেও তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, গ্রাহকসেবা, পরিবহন ও প্রশাসনিক কাজের মতো খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে দক্ষতাভিত্তিক নতুন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

