দেশের আর্থিক খাতে বড় একটি সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একীভূত পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় সহায়তায় পুনরায় মূলধন জোগান দিয়ে টিকিয়ে রাখা হবে—এই প্রশ্ন এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি বাজেট-পূর্ব আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, এই পাঁচ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সামনে দুটি পথ খোলা আছে—একদিকে করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে আমানতকারীদের প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার দায় ধীরে ধীরে পরিশোধ করা, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময় পর সম্মিলিত ব্যাংকটিকে নতুন করে মূলধন দিয়ে শক্তিশালী করা। তবে এই দ্বিতীয় পথ দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের আর্থিক সক্ষমতা বা রাজস্ব পরিস্থিতি এই ধরনের বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূল্যায়ন করা হচ্ছে—বেসরকারিকরণ দ্রুত করা হবে, নাকি রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্গঠন করা হবে।
এর আগে ব্যাংক রেজল্যুশন সংক্রান্ত আইন সংশোধনের মাধ্যমে একীভূত ব্যাংকগুলোর পুরনো মালিকদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংক আপাতত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভবিষ্যতে পুনরায় বেসরকারি খাতে যাওয়ার পথ খোলা রয়েছে।
এই পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে তারল্য সহায়তা হিসেবে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি মূলধন জোগান হিসেবে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তবুও ব্যাংকগুলোর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ঋণের মান। ব্যাংকগুলোর মোট কার্যকর ঋণ মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায়। অনেক ক্ষেত্রে এই ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। গভর্নরের ভাষায়, এসব অর্থকে প্রচলিত অর্থে ঋণ বলা কঠিন; বরং এগুলো অনিয়ম বা অপব্যবহারের ফল।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এমন সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে সেই পথও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ অধিকাংশ ঋণের পেছনে কার্যকর নিরাপত্তা নেই।
এদিকে সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গভর্নর জানিয়েছেন, সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু তথ্য সঠিক নয়। তিনি বলেন, সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ কমেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়।
ডেপুটি গভর্নরও একই বক্তব্য দিয়ে বলেন, গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারী ট্রেজারি বিল বা বন্ড কেনেনি। সরকারের আয়-ব্যয়ের স্বাভাবিক লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা অর্থনীতির নিয়মিত অংশ। এখানে নতুন করে টাকা ছাপানোর কোনো বিষয় নেই; মূল বিবেচ্য বিষয় হলো বাজারে মোট মুদ্রা সরবরাহ বাড়ছে কি না। সব মিলিয়ে, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ এখন নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

