দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক শেয়ারধারীদের কোনো জবাবদিহি বা শাস্তি ছাড়াই আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ দিলে পুরো ব্যাংকিং খাত নতুন করে ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, অতীতে অনিয়ম ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়ে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আনা হলে আস্থা সংকট আরও গভীর হবে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, একীভূত করা ব্যাংকগুলো থেকে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিপুল অর্থ সরিয়ে নিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শাস্তির পরিবর্তে তাদের জন্যই আবার ফিরে আসার পথ তৈরি করা হয়েছে। এতে অনিয়মকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, ঋণ পুনঃতফসিলের নিয়ম এতটাই শিথিল করা হয়েছে যে, সামান্য অগ্রিম জমা দিয়েই বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ মিলছে। ফলে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করা গেলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না। নীতিমালার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনিয়মকারীরা বারবার সুবিধা নিচ্ছে। এতে সৎ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আরেকজন বিশ্লেষক জানান, আইন সংশোধনের কিছু ধারা এমনভাবে করা হয়েছে, যা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চিত করে এবং বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে। এতে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠছে এবং খাতটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একসময় তুলনামূলক কম থাকা এই ঋণ এখন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত তথ্য দীর্ঘদিন গোপন থাকার কারণে হঠাৎ করেই বড় আকারে এই চিত্র সামনে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভিন্ন পরিচয়ে আবারও ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, হঠাৎ করে কোনো ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। কারণ ব্যাংকগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি ব্যাংকের ধস অন্যগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তারা সতর্ক করে বলেন, ব্যাংক খাতে যারা অনিয়ম করেছে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে নতুন করে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক হারে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না এবং সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

