অর্থনীতি যখন দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার চাপে, তখন দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফা নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, বিনিয়োগে ভাটা এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেও ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে যে আয় বৃদ্ধি দেখা গেছে, তা সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করে। বড় কিছু শিল্পগোষ্ঠীর কার্যক্রম কমে যায়, নতুন বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকিং খাতেও চাপ পড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। বরং বেশ কয়েকটি ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা দেখিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। আরও কয়েকটি ব্যাংক প্রায় সেই স্তরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—অর্থনীতি দুর্বল হলেও ব্যাংকগুলো কীভাবে এত আয় করছে?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় অংশ এসেছে প্রচলিত ঋণ কার্যক্রম থেকে নয়, বরং বিকল্প উৎস থেকে। ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো বিপুল অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। এসব খাতে ঝুঁকি কম এবং সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া গেছে।
একই সময়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ সহজ হওয়ায় অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কাগজে নিয়মিত হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার কমেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে। কম প্রভিশন রাখতে হওয়ায় নিট মুনাফা বেড়ে গেছে।
এছাড়া ব্যয় সংকোচন, ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে আয় এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভও মুনাফা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। এমনকি কিছু ব্যাংক প্রকৃত ঋণ আদায়ে বড় সাফল্য না পেলেও হিসাবের কৌশলগত ব্যবস্থাপনায় লাভ দেখাতে পেরেছে—যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বড় কারণ মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। প্রথমত, সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে উচ্চ সুদের হার ব্যাংকগুলোর জন্য সহজ আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড়ের কারণে অনেক ঋণ পুনর্গঠন করে হিসাবের ভারসাম্য ঠিক রাখা সম্ভব হয়েছে।
শীর্ষ মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশিরভাগের খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক কম। এতে তাদের প্রভিশন চাপ কমেছে এবং আয় বাড়াতে সুবিধা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু ব্যাংক উল্লেখযোগ্য হারে মুনাফা বৃদ্ধি দেখিয়েছে মূলত ঋণ আদায় বৃদ্ধি, অবলোপন করা ঋণ থেকে পুনরুদ্ধার এবং ট্রেজারি খাতের আয়ের কারণে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত উৎপাদন ও বিনিয়োগ না বাড়লে কেবল হিসাবভিত্তিক মুনাফা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সার্বিকভাবে, ব্যাংকগুলোর এই মুনাফা একদিকে স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার সঙ্গে এর ব্যবধান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে ঋণখাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

