ব্যবসা চালাতে বাড়তি পুঁজি দরকার, কিন্তু ব্যাংকের কাছে গিয়ে প্রয়োজনমতো ঋণ পাচ্ছেন না অনেক উদ্যোক্তা। কেউ আবেদনের তুলনায় অনেক কম টাকার প্রস্তাব পাচ্ছেন, কারও আবেদন মাসের পর মাস আটকে থাকছে। অন্যদিকে অনিশ্চয়তার কারণে বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কম। ফলে ঋণের চাহিদা, ব্যাংকের সতর্কতা ও বিনিয়োগের স্থবিরতা মিলিয়ে বেসরকারি খাতের সংকট দীর্ঘ হচ্ছে।
প্রথম আলোর ০১ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:০০টায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছোট থেকে বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এমন অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টানা ছয় মাস বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির একটি উদাহরণ স্মারকপণ্য প্রস্তুতকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান হাতবাক্স। ব্যবসার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে ২০ লাখ টাকা ঋণ চেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংক দিতে চাইছে মাত্র ৪–৫ লাখ টাকা। জামানত রাখতে পারলে সম্পদের মূল্যের ৭০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
হাতবাক্সের প্রধান নির্বাহী শাফাত কাদিরের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন উদ্যোক্তা হওয়ায় তাঁদের জামানত দেওয়ার মতো সম্পদ নেই। তবে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত লেনদেন রয়েছে এবং চলমান ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করা হচ্ছে। আড়াই বছর আগে দুটি ব্যাংক থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পেয়েছিলেন তিনি। এখন চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ অর্থ দিয়ে ব্যবসার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহব্যবস্থার ভিত্তিতে ঋণ পেতে অন্য একটি ব্যাংকে আবেদন করেও তিন মাসে অর্থ পাননি।
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে চট্টগ্রামের হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি ২০ কোটি টাকা ঋণ চাইলেও ব্যাংক প্রস্তাব দিয়েছে তিন–চার কোটি টাকার। প্রয়োজনের তুলনায় অঙ্কটি অনেক কম হওয়ায় সেই ঋণ নিতে প্রতিষ্ঠানটির আগ্রহও কম।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছানের ভাষ্য, আগে ব্যাংকগুলো জামানতের মূল্যের ১২০ শতাংশ বা তারও বেশি ঋণ দিত। এখন ৭০–৮০ শতাংশের বেশি দিতে চাইছে না। অথচ ব্যবসায় পুঁজির প্রয়োজন বেড়েছে। আগে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছাতে ৪৫ দিন লাগলেও এখন সময় লাগছে তিন মাস। অর্থ ফিরে আসতে দেরি হওয়ায় বাড়তি পুঁজি দরকার হচ্ছে, কিন্তু ব্যাংকের সহায়তা মিলছে না। এতে ব্যবসার সুযোগ হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইস্পাতশিল্পেও বাড়তি অর্থের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। আরআরএম গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংকে অনুমোদিত ঋণসীমা রয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আরও ২০০ কোটি টাকার ঋণসীমা চেয়েছে গ্রুপটি। তবে ব্যাংক তা অনুমোদন করছে না।
আরআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সুমন চৌধুরীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইস্পাতবাজারের ৯০ শতাংশ রয়েছে ৪৮টি কোম্পানির হাতে। এর মধ্যে ৩০–৩২টি প্রতিষ্ঠান বাড়তি ঋণসীমা চেয়েও পায়নি। অর্থসংকটের কারণে এসব কোম্পানি সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে।
বন্ধ কারখানা চালু করার উদ্যোগেও অর্থ ছাড়ের গতি কম। গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয় বন্ধ কলকারখানা চালুর জন্য। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই অংশ থেকে বিতরণ হয়েছে ৫৬১ কোটি টাকা। একই সময় পর্যন্ত পুরো ৬২ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
নিট পোশাকশিল্পের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য এনএইচ অ্যাপারেলস, মুন্সি অ্যাটায়ার্স, ডিকে নিটওয়্যার ও ফতুল্লা ফ্যাশনসহ ৭৮টি বন্ধ কারখানা এই তহবিল থেকে ঋণের আবেদন করেছে। আবেদন করেছে আংশিক বন্ধ আরও ১০৯টি কারখানাও। তবে মালিকেরা প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের জানা মতে নিট পোশাক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠান তখন পর্যন্ত এই প্রণোদনার ঋণ পায়নি। আংশিক চালু দু–চারটি কারখানার বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গেলেও বন্ধ কোনো কারখানার ঋণ ব্যাংকের পর্ষদে অনুমোদিত হয়নি। তাঁর মতে, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগ্রহ থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক শিল্পঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যক্রম গুটিয়ে রেখেছে। নতুন ঝুঁকি নিতে চাইছে না তাদের পরিচালনা পর্ষদ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন বিনিয়োগ কম হওয়ায় শিল্পে ঋণও কম যাচ্ছে। বিতরণ করা অর্থের বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে। পাশাপাশি কিছু ভোক্তাঋণ দেওয়া হচ্ছে। অতীতে বেনামে বিতরণ করা অনেক ঋণ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে না লাগায় ব্যাংক খাতের অবস্থাও দুর্বল হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মার্চে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলেও একই হার ছিল। মে মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হলেও জুন ও জুলাইয়ে আবার কমে যায়। আগস্টে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ঋণের গতি কমে যাওয়ার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০১০–১১ অর্থবছরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা হয় ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে–পরে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির চিত্রও পাওয়া গেছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২১ মাস পর নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ নেওয়ার খরচ কমেছে। ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগও তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ভালো উদ্যোক্তা এখন ১০ শতাংশের কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন।
ঋণ বিতরণ বাড়াতে রাষ্ট্রীয় সোনালী ব্যাংকের ওপর আরোপিত ঋণসীমাও তুলে নেওয়া হয়েছে। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর মতে, সমস্যায় থাকা অনেক ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম কমিয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগও তেমন হচ্ছে না। তবে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ শুরু হওয়ায় ঋণের প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
বিএনপি সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, করনীতি এবং ঘুষ–দুর্নীতির সমস্যাও বড় বিবেচ্য বিষয়।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির সহসভাপতি আবুল কাসেম খানের মতে, সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তার সুফল পেতে সময় লাগবে। প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতি ও দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দূর করা, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুতে উৎসাহ দেওয়ার সঙ্গে কার্যকর প্রণোদনা যুক্ত করার প্রয়োজন দেখছেন তিনি।

