বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে। এর আগে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড ছিল গত জুনে, ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে একদিকে চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট যুক্ত হয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধিকে এই অবস্থায় নামিয়ে এনেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশির ভাগ সময় দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। পরের মাসে তা নেমে আসে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে গত মার্চে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নামে। জুনে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এরপর সামান্য বেড়ে জুলাইয়ে হয় ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং আগস্টে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে এসে আবার তা কমে নতুন রেকর্ড তলানিতে ঠেকেছে।
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাবে ব্যাংকগুলোর হাতে রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য জমেছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ নেই।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে বৈশ্বিকভাবেই চাহিদা কমায় দেশের রপ্তানি তেমন বাড়ছে না। অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাহিদা কম। ফলে পণ্য উৎপাদন করে বিক্রির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, আর এ কারণেই কমেছে ঋণের চাহিদা। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় গ্যাসের নিশ্চয়তাও পাচ্ছেন না উৎপাদকেরা। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খুব শিগগির চাহিদা বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর মতে, সরকারকে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
ব্যাংকারেরা জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয় আগের সুদ যোগ করে। সুদ আদায় হোক বা না হোক, ঋণ নিয়মিত থাকলেই তার বিপরীতে সুদ যোগ করে প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, আর আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ কারণে বেসরকারি খাতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে বলে ব্যাংকারেরা মনে করেন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে সুদের যোগ করা অংশও রয়েছে।
আর্থিক খাতে গতিশীলতা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। শিল্প, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতের জন্য কম সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ কারখানা সচল করা এবং উৎপাদন বাড়ানোই এই প্যাকেজের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছর থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হিসাব রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো খারাপ অবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর আগে শুধু ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে একবার প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, অর্থাৎ এক অঙ্কের ঘরে ছিল। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
পরে করোনার মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে এবং পরের অর্থবছরে আরও কমে হয় ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আবার বেড়ে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠলেও এরপর থেকে প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা নেমেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। তবে এত কম প্রবৃদ্ধি চলতে থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান আশানুরূপ হবে না। তিনি বলেন, করোনা মহামারির পর থেকে একের পর এক বৈশ্বিক সংকট লেগেই আছে। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর টাকার বিপরীতে ডলারের দর অনেক বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়, ফলে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে উঠে যায়।
এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেই ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ব্যবসার আড়ালে নানা জালিয়াতি করেছেন, এমন অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ আরেক দফা সংকটে ফেলেছে অর্থনীতিকে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং নতুন করে বিনিয়োগের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

