মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রস্তুতকারক আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের পোশাক শিল্প আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণ আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে চীন ও ভারত থেকে কাঁচামাল আনতে দেরি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা আগের কম দামে নেওয়া অর্ডার এখন লোকসানে শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের আলোচনা শুরু করেছেন।
খাতের নেতারা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প কম।
এদিকে সুতা উৎপাদন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। একটি বড় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি তাদের পণ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়াবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স এবং প্রাইমার্ক–এর মতো বড় ব্র্যান্ড রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই সংঘাতের কারণে ভারত ও বাংলাদেশের সরবরাহকারীরা চাপে পড়ায় এসব ব্র্যান্ডের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। কিছু ক্রেতা আপাতত বাড়তি খরচ নিজেদের বহনের কথা ভাবলেও ভবিষ্যতে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পেও সংকট বাড়ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক স্পিনিং মিলগুলোকে প্রি-শিপমেন্ট ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। এতে কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে এবং কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন পরিকল্পনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংকিং সহায়তা সহজ করা এবং দ্রুত কাঁচামাল আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে না পেলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সঙ্গে বাস্তবসম্মত মূল্য সমন্বয় না হলে উৎপাদকদের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

