দেশের নিটওয়্যার রপ্তানি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. হাতেম। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই ঘণ্টা করে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই বন্ধের সময়সীমা আরও বেড়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টায় দাঁড়াচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরও জানান, বিশেষ করে ভালুকা ও রাজেন্দ্রপুর এলাকার কারখানাগুলো পল্লী বিদ্যুতের আওতায় থাকায় সেখানে লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। এতে উৎপাদন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রপ্তানি অর্ডার সময়মতো সম্পন্ন করাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি তেলের সংকটও শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার নীতিগত বিধিনিষেধের কারণে ড্রামে তেল সরবরাহও বন্ধ থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সোলার বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সেখানে কর নীতিমালার জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, নীতিগত সহায়তা ছাড়া বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা শিল্প মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশও হ্রাস পেয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিক ব্যয় ও জ্বালানি সংকট মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
ব্যাংকিং ও কাস্টমস সেবায় জটিলতা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, এলসি খোলা থেকে শুরু করে শিপমেন্ট ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে জটিলতা তৈরি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের নিয়মিত সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কাস্টমসে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও অনিশ্চয়তা ব্যবসার গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে ফজলে শামীম এহসান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনেক দেশে জ্বালানি মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও বাংলাদেশে তুলনামূলক কম বৃদ্ধি হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যায়। তবে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া শিল্প খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস—এই দুইয়ের চাপ মিলিয়ে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প এখন এক ধরনের সমন্বিত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধান না এলে উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

