বিশ্ব অর্থনীতিতে নীরবে এক বড় পরিবর্তন ঘটছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্টেবলকয়েন। অস্থির ক্রিপ্টোকারেন্সির বাইরে এই নতুন ডিজিটাল মুদ্রা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে। প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, ডলারনির্ভর বাণিজ্য কাঠামো ও ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং নীতিগত ও কৌশলগত এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাপী স্টেবলকয়েন ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যেই এই খাতে লেনদেনের পরিমাণ ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের পর থেকে বছরে গড়ে ১৩৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছাতে পারে ১.৫ কোয়াড্রিলিয়ন ডলারে, যা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
স্টেবলকয়েন মূলত এমন এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা, যার মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সেটিকে সাধারণত কোনো সরকারি মুদ্রা, যেমন মার্কিন ডলার, কিংবা সোনা বা অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো অস্থিরতার ঝুঁকি কম থাকায় এটি দৈনন্দিন লেনদেন, সঞ্চয় এবং প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠছে। বর্তমানে সবচেয়ে প্রচলিত স্টেবলকয়েনগুলো নগদ অর্থ, ব্যাংক জমা বা স্বল্পমেয়াদি সরকারি বন্ড দ্বারা সমর্থিত থাকে, যা তাদের প্রতি আস্থা তৈরি করে।
প্রযুক্তিগতভাবে স্টেবলকয়েন ব্লকচেইনভিত্তিক হওয়ায় এতে কিছু বড় সুবিধা রয়েছে। যেমন, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ছাড় করার ব্যবস্থা, ২৪ ঘণ্টা লেনদেনের সুযোগ এবং একই সঙ্গে অর্থ ও চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সুবিধা। এসব কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ দুটোই কমে যায়।
বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় আসে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলে এই অর্থ পাঠাতে খরচ হয় ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত, যেখানে স্টেবলকয়েন ব্যবহারে তা প্রায় ১ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। এতে বছরে ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন না থাকলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে স্টেবলকয়েনের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে ইউএসডিটি ও ইউএসডিসির মতো ডিজিটাল ডলার বিভিন্ন উপায়ে দেশে প্রবেশ করছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় ছায়া অর্থনীতি, ডলার নির্ভরতা বৃদ্ধি এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্টেবলকয়েন ব্যবহারের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও জড়িত। ব্যাপকভাবে ডলারভিত্তিক স্টেবলকয়েন ব্যবহার হলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। আবার কোনো স্টেবলকয়েনের ওপর আস্থা হঠাৎ কমে গেলে তা আর্থিক স্থিতিশীলতায় ধাক্কা দিতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহারের পথ বেছে নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, জাপান বা হংকংয়ের মতো অর্থনীতিগুলো নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ভাবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করছে। অঞ্চলভিত্তিকভাবে কেউ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে, আবার কেউ লাইসেন্সের মাধ্যমে সীমিত ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে নিজস্ব টাকাভিত্তিক স্টেবলকয়েন চালু করা, যা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় সম্পদ দ্বারা সমর্থিত থাকবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেনের সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি মুদ্রানীতির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে। শুরুতে প্রবাসী আয় পাঠানোর খাতে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা যেতে পারে।
ধরা যাক, একজন প্রবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্য থেকে অর্থ পাঠাতে চান। তিনি প্রথমে স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে অর্থ পাঠাবেন, যা দেশে এসে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকাভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রায় রূপান্তরিত হবে। এতে সময় কম লাগবে, খরচও কমবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে কাজ করছে। তবে এর পাশাপাশি স্টেবলকয়েন নিয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ না নিলে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন আরও বাড়তে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সবকিছু মিলিয়ে, স্টেবলকয়েন এখন আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়; এটি ইতোমধ্যেই বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—এই পরিবর্তনকে নিজস্ব নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে সুবিধা নেওয়া, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় এর প্রভাব বহন করা। সঠিক পরিকল্পনা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে দেশের অর্থনীতির জন্য শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।

