চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বড় ধরনের প্রবাহ তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণভিত্তিক প্রচলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বন্দরটি এখন ধীরে ধীরে ল্যান্ডলর্ড মডেলে রূপ নিচ্ছে, যেখানে অবকাঠামো দেবে কর্তৃপক্ষ আর পরিচালনায় আসবে বেসরকারি বিনিয়োগ।
চট্টগ্রাম বন্দর বহুদিন ধরেই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৭৭ সালে সীমিত কনটেইনার পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বছরে লাখ লাখ কনটেইনার ও বিপুল পরিমাণ কার্গো হ্যান্ডলিং করছে এই বন্দর। এখন এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দর ঘিরে বড় বড় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আগ্রহ বেড়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক একটি কোম্পানির মাধ্যমে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে বেসরকারি অংশগ্রহণ শুরু হয়। এরপর সিঙ্গাপুর ও দুবাইভিত্তিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো বে-টার্মিনাল প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একই সঙ্গে ডেনমার্কের শীর্ষ শিপিং গ্রুপ লালদিয়া এলাকায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণে এগিয়ে এসেছে।
দেশীয় খাতেও বিনিয়োগের গতি দেখা যাচ্ছে। একটি বহুজাতিক দেশীয় প্রতিষ্ঠান পতেঙ্গায় নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে জাহাজ ভেড়ানো এবং বড় পরিসরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ থাকবে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে বেসরকারি উদ্যোগে ড্রাইডক ও জেটি স্থাপনের মাধ্যমে বিকল্প সুবিধাও তৈরি হয়েছে, যা বন্দরের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর এখন ধীরে ধীরে সার্ভিস পোর্ট ও টুলস পোর্টের ধাপ পেরিয়ে ল্যান্ডলর্ড পোর্টে পরিণত হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ জমি ও নীতিগত সহায়তা দেবে, আর বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। এতে একদিকে সরকারি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা যুক্ত হবে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়েও বিদেশি বিনিয়োগের আলোচনা চলছে। এ নিয়ে অতীতে শ্রমিকদের আপত্তি থাকলেও সরকার বলছে, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে সেবার মান উন্নত হবে, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে এবং পণ্য পরিবহন খরচ কমে আসবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে বন্দর আরও কার্যকর হয়ে উঠবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকল্প মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে বড় অংশই আসছে বিদেশি উৎস থেকে। এতে করে বন্দরটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ প্রবাহ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু দেশের বাণিজ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে। তবে এর জন্য নীতিগত স্বচ্ছতা, দক্ষ তদারকি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

