স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের ওষুধ শিল্প নতুন সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে খাতটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের আরও শক্তভাবে প্রস্তুত করার সময় পাবে এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত। তবে সরকার সময়সীমা ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই অতিরিক্ত সময়কে শিল্প খাতের জন্য একটি ‘রূপান্তরকাল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা হঠাৎ পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে।
দেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং ১৫০টির বেশি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে প্রায় ২১ কোটি ডলারের বেশি। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা–এর ট্রিপস চুক্তি–এর অধীনে পাওয়া বিশেষ সুবিধা, যার ফলে বাংলাদেশ পেটেন্ট সুরক্ষা ছাড়াই সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে।
তবে এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসবে। তখন পেটেন্ট আইন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের মতো নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। এই প্রেক্ষাপটে সময় বাড়ানো হলে কোম্পানিগুলো ধাপে ধাপে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত সময় শিল্পকে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সহায়তা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইউরোপের ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–এর গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেসের মতো মানদণ্ড পূরণে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ মিলবে।
একই সঙ্গে উৎপাদন অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বায়োটেকনোলজি, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণার ঘাটতি পূরণে এই সময় সহায়ক হবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পুরোপুরি চালু করা গেলে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে আসবে। পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং একাডেমিয়া ও শিল্পের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হলে উদ্ভাবননির্ভর ওষুধ উৎপাদনে এগোনো সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণ দেশের জন্য বড় অর্জন হলেও সেটিকে টেকসই করতে পরিকল্পিত প্রস্তুতি জরুরি। এই তিন বছরের অতিরিক্ত সময়কে যদি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উচ্চমূল্যের উদ্ভাবনী পণ্য তৈরির দিকেও এগোতে পারবে। সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত সময় বৃদ্ধি ওষুধ শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে—যা সঠিক নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
সিভি/কেএইচ

