দেশের তালিকাভুক্ত উৎপাদন খাত ২০২৫ সালে সামান্য মুনাফা বাড়ালেও অধিকাংশ শিল্পে লাভ কমেছে বা লোকসান বেড়েছে। উচ্চ সুদহার, দুর্বল চাহিদা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশ কঠিন হয়ে ওঠায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরজুড়ে মোট মুনাফা কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকায়। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ওষুধ এবং বিদ্যুৎ খাত থেকে। অন্যদিকে কাগজ, চামড়া, সিমেন্ট ও সিরামিকসহ বেশিরভাগ শিল্পেই লাভ কমেছে, অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
ওষুধ খাতের ২৭টি কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫৮ কোটি টাকা লাভ করেছে, যদিও আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম। টেলিযোগাযোগ খাতে মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম। বিপরীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে—এ খাতের মুনাফা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ২ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রকৌশল খাতেও কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা ছিল, যেখানে মুনাফা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খাতের লাভ মাত্র ৩.৯ শতাংশ বেড়েছে, যা খুবই সীমিত। কাগজ, সিরামিক, চামড়া ও সিমেন্ট খাতে তিন অঙ্কের হারে মুনাফা কমেছে, আর বস্ত্র খাতে লাভ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, কোম্পানিগুলোর মোট আয় ৪.৬ শতাংশ বাড়লেও অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে ১২.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণের সুদ বাড়ার কারণে ব্যবসার খরচ দ্রুত বেড়েছে, যা লাভ কমিয়ে দিয়েছে।
পুরো বছরে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান এক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করতে পেরেছে। অন্যদিকে কয়েকটি বড় কোম্পানি উল্লেখযোগ্য লোকসানে পড়েছে, যার মধ্যে কাগজ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষে রয়েছে।
অনেক শিল্প ২০২৪ সালে লাভে থাকলেও ২০২৫ সালে লোকসানে চলে গেছে। বিশেষ করে সিমেন্ট ও সিরামিক খাতে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। নির্মাণ খাতে চাহিদা কমে যাওয়া, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদহার এই খাতগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব কোম্পানির ঋণের পরিমাণ বেশি, তারা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। সুদের হার ৯ শতাংশের কাছাকাছি থেকে বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশে ওঠায় তাদের ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রার অস্থিরতায় আমদানি খরচ বাড়ায় লাভ আরও কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই সময়ে আগের প্রান্তিকের তুলনায় আয় কমেছে ২ শতাংশ এবং মুনাফা কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সেই আশাবাদ টেকেনি।
ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছরও শিল্প খাত চাপের মধ্যেই থাকতে পারে। কাঁচামালের দাম বাড়া, সরবরাহে বিলম্ব এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শিল্পগুলো ইতিমধ্যে বেশি প্রভাব অনুভব করছে।
বিশেষ করে সিমেন্ট খাত বর্তমানে বড় সংকটে রয়েছে। গত এক দশকে ব্যাপক বিনিয়োগে উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে, কিন্তু চাহিদা সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে কারখানাগুলো কম সক্ষমতায় চলছে এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে। অনেক কারখানা ৩০ শতাংশেরও কম সক্ষমতায় উৎপাদন করছে, যেখানে স্বাভাবিক মানদণ্ড ৭০-৮০ শতাংশ।
২০২৪ সালে সিমেন্ট খাতে যে সামান্য মুনাফা ছিল, তা ২০২৫ সালে লোকসানে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সিরামিক খাতেও লাভ থেকে লোকসানে নেমে গেছে। বড় প্রকল্প স্থবির হয়ে থাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় এই খাতগুলোতে চাহিদা কমেছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমানো, নগদ প্রবাহ ঠিক রাখা এবং ঝুঁকি মোকাবিলার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠা না গেলে শিল্প খাতের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
সিভি/কেএইচ

