মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্বজুড়ে ইউরিয়া সারের বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি সার সরবরাহ ব্যবস্থাও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় কয়েক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে এ সারটির দাম প্রায় ৪২ শতাংশ এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্পট বাজারে মোট বৃদ্ধির হার প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে কৃষিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর কমোডিটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ইউরিয়ার গড় আন্তর্জাতিক দাম ছিল টনপ্রতি ৪১৫ দশমিক ৪ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭২ ডলারে। এরপর মার্চে দাম লাফিয়ে বেড়ে ৭২৫ দশমিক ৬ ডলারে পৌঁছায়। সর্বশেষ স্পট বাজারে প্রতি টনের দাম ৮০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, আর শনিবার শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে তা ৮৫০ ডলারে উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে স্পট বাজারে ক্রেতাদের ঝোঁক বাড়ায় দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের চুক্তির বাইরে গিয়ে উচ্চ দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। দেশে গ্যাস সংকটের কারণে ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। বর্তমানে দেশের বড় অংশের সার কারখানা বন্ধ রয়েছে, কেবল নরসিংদীর ঘোড়াশাল–পলাশ সার কারখানা সীমিত আকারে চালু আছে, যার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮০০ টন। বর্তমানে দেশে ইউরিয়ার মজুদ চার লাখ টনের নিরাপদ সীমার নিচে নেমে এসেছে। সর্বশেষ হিসাবে মজুদ রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন। এ অবস্থাকে কৃষি উৎপাদনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন আসন্ন আমন মৌসুম সামনে রেখে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রথম দুই দফা আন্তর্জাতিক দরপত্রে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। প্রথম দফায় কোনো প্রস্তাবই আসেনি এবং দ্বিতীয় দফায় মাত্র ৫০ হাজার টনের প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা মোট চাহিদার একটি ছোট অংশ।
এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরকার–টু–সরকার চুক্তির মাধ্যমে তিন লাখ টন ইউরিয়া আনার আলোচনা চলছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন স্বাভাবিক না হলে এসব সরবরাহ অনিশ্চিত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত আমদানির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। সরকার গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশীয় সার উৎপাদন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী মে মাসের শুরুতে কয়েকটি বড় সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হলে উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৃষি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। আগে দেশীয় উৎপাদনই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে গেছে। এখন আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।
তারা মনে করেন, শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে আমদানির চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও ঘটবে। চলতি মৌসুমে সার সংকট অব্যাহত থাকলে আসন্ন আমন ধান উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

