উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার চাপে সঞ্চয়ের সক্ষমতা হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফলে নতুন করে সঞ্চয়পত্র কেনার প্রবণতা কমে গেছে, বরং আগে কেনা সঞ্চয়পত্র ভেঙে নগদ অর্থ তুলে নেওয়ার হার বেড়েছে। এ কারণে টানা চার বছর ধরে এই খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
সরকারি তথ্য বলছে, যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে মেয়াদপূর্তি ও আগাম ভাঙানোর কারণে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার এই খাত থেকে কোনো নতুন অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে না, বরং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের হাতে অতিরিক্ত সঞ্চয়ের টাকা থাকছে না। সংসারের দৈনন্দিন খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে অনেকেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের নিরাপদ সঞ্চয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই খাত এখন চাপে পড়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও এর প্রভাব স্পষ্ট। কেউ সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ মেটাতে, আবার কেউ আবাসন ব্যয় বা ঋণ পরিশোধ করতে সঞ্চয়পত্র ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোই হয়ে উঠছে অগ্রাধিকার।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। বড় বিনিয়োগকারীরা এখন তুলনামূলকভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি ধীরে ধীরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে আনার ফলে এটি আগের মতো আকর্ষণীয় থাকছে না।
বর্তমানে দেশে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে, যেখানে মেয়াদ শেষে গড়ে ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। তবুও বাজারের বাস্তবতায় এই হার অনেকের কাছে পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না, বিশেষ করে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, অতীতেও কয়েক বছর ধরে এই খাতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং তার আগের বছরও ছিল বড় অঙ্কের ঘাটতি। এতে বোঝা যাচ্ছে, সমস্যা সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত।
এই পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সহজ পথ হিসেবে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে বেশি। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্র খাতকে আবার কার্যকর করতে হলে মুনাফার হার পুনর্বিবেচনা, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে এবং সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।

