বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সংকট এবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছর শেষে সংস্থাটির লোকসান ৬৩ হাজার ৪২২ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা হবে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঘাটতি। উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং দীর্ঘদিন বিদ্যুতের দাম সমন্বয় না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিতরণকারী সংস্থাগুলোও গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। মে মাসে এ নিয়ে গণশুনানি হওয়ার কথা রয়েছে এবং জুলাই থেকে নতুন দর কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১২ টাকা। তবে চলতি অর্থবছর শেষে তা ১৩ টাকার বেশি হতে পারে। অন্যদিকে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম ৭ টাকারও নিচে রয়েছে। ফলে প্রতি ইউনিটে ৬ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও অপরিকল্পিত বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন বড় কারণ। গত দেড় দশকে বেসরকারি খাতে বিপুল সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার অনেকগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ অত্যন্ত বেশি। এসব কেন্দ্র চালু থাকুক বা না থাকুক, সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও কয়লার দাম কম থাকলেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বিশ্ববাজারে তেল ও কয়লার দাম বাড়তে শুরু করলে দেশেও ফার্নেস অয়েলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণেই চলতি অর্থবছরে পিডিবির অতিরিক্ত ব্যয় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
গত কয়েক বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। পাঁচ বছরে পিডিবির মোট লোকসান দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি এখন রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি ভর্তুকি কমানো ও মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের শর্তও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে অনেকেই অনিবার্য বললেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কারণ পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি খুচরা গ্রাহকের ওপর পড়বে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা দাম বাড়ানো গেলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব হবে। তবে তাতেও পুরো ঘাটতি পূরণ হবে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, প্রস্তাবগুলোর কারিগরি যাচাই চলছে। সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং গ্রাহক পর্যায়ের প্রভাব বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দাম বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংকট সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন কাঠামো পুনর্বিন্যাস, উচ্চ ব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্মূল্যায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং দুর্বল চুক্তিগুলো পর্যালোচনা ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমবে না। অন্যথায় প্রতি বছর বাড়তি ভর্তুকি ও মূল্যবৃদ্ধির চক্রে আটকে পড়বে পুরো খাত, যার শেষ চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।

