গত ৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ বাংলাদেশ–দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম সভা। ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী নেতৃত্ব দেন।
অন্যদিকে দুবাই সরকারের পোর্টস, কাস্টমস ও ফ্রি জোনস করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের আবদুল্লাহ আল নেয়াদি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যুবরাজ নারায়ণসহ চারজন প্রতিনিধি অংশ নেন। সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য করা চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করার প্রস্তাব দেয়। এখানেই শেষ নয়, প্রতিষ্ঠানটি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও পরিচালনার আগ্রহও প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ–দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বৈঠকে এটিকে পৃথক প্রকল্প হিসেবে আলোচনা করার সিদ্ধান্তও এসেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল দুইটি ঘিরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থ:
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল একসঙ্গে পরিচালনার সুযোগ পেলে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য এটি বড় পরিসরের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করবে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত টার্মিনালগুলোর একটি। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী বড় জাহাজ এবং একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে এর পাশেই থাকা চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালে একসঙ্গে দুটি জাহাজ ভেড়ানো যায়। পরিচালন সক্ষমতার দিক থেকে নিউমুরিং টার্মিনাল বছরে প্রায় ১৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করে বছরে আরও প্রায় ৭ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।
তুলনামূলকভাবে, বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। এই টার্মিনাল বর্তমানে সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল পরিচালনা করছে। এই তিনটি টার্মিনালের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, নিউমুরিং ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল একসঙ্গে পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে বছরে প্রায় ২২ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা চলে আসবে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ দেখালেও বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ বলছে, বিদেশি বিনিয়োগ বা পরিচালনা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। তবে তারা মনে করেন, আগের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হওয়া চুক্তির পর বন্দর ব্যবস্থাপনায় দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরও সতর্কভাবে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই রায় প্রকাশের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে কর্মরত কিছু কর্মচারী বন্দর ভবন, ফয়্যার এবং আশপাশের এলাকায় মিছিল করেন। সেদিনের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবীর, পাশাপাশি বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজিম ও ফরিদুর রহমান।
এরপর এনসিটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে একাধিক সংগঠন একত্র হয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলে। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন।
এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) মোট সাত দিন ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে বন্দরে পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ইয়ার্ডে কনটেইনার জমে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজানের পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখা হয়। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারির পর নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না করলেও আন্দোলন থেমে যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, এনসিটি ও সিসিটি ইস্যুতে তাদের অবস্থান আগের মতোই রয়েছে। তারা এ বিষয়ে সরকারের কাছে চিঠিও দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সরকার যদি আবারও এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে, তাহলে তারা তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানাবেন। তাঁর ভাষায়, ডিপি ওয়ার্ল্ড সিসিটি নিয়েও আগ্রহ দেখাতে পারে এবং কিছু মহল এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে বলে তারা মনে করেন। তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি এমন সিদ্ধান্তের দিকে এগোয়, তাহলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ফারুক আহমেদ বলেন, এ ধরনের চুক্তি করা না করা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। তিনি মনে করেন, সরকার প্রয়োজন মনে করলে চুক্তি করতেই পারে। তবে ব্যবসায়ীদের মূল প্রত্যাশা হচ্ছে স্থিতিশীল পরিবেশ। তিনি বলেন, “আমরা চাই পরিবেশ শান্ত থাকুক। কারও স্বার্থকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হোক, এটা আমরা চাই না। অতীতেও এ ধরনের আন্দোলনে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
অন্যদিকে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, জনগণের নির্বাচিত সরকার দেশের স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, চুক্তির বিরোধিতা থাকলে তা আগে যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। তাঁর ভাষায়, “কেন চুক্তি করা যাবে না, সেই যুক্তি আগে সামনে আনতে হবে। যৌক্তিক বিরোধিতা হলে আমরা সেটি শুনব। কিন্তু রাস্তা বন্ধ, মশাল মিছিল বা বিক্ষোভ করে পরিস্থিতি অস্থির করার কোনো মানে নেই।”
তিনি আরও বলেন, এমনভাবে চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা উচিত নয়। ব্যবসায়ীরা সব সময় স্থিতিশীল পরিবেশ চান। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।