আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) জন্য কর ও শুল্কে বড় ধরনের ছাড়ের প্রস্তাব দেশের উদীয়মান ইভি বাজারে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের এই উদ্যোগকে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, এতে স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় আমদানি বেশি সুবিধা পেতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে দূষণ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাকের জন্য বিদ্যমান কর সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ও করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর মোট করের বোঝা ৯৩ শতাংশ থেকে কমে ৬৪ শতাংশে নামবে। আর ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে করের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ শতাংশ।
চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণেও বড় সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিক চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে প্রায় ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ কর ও শুল্ক দিতে হলেও নতুন বাজেটে এসব পণ্যের ওপর সব ধরনের কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন, ব্যাটারি নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক খাতেও কর সুবিধা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ মে পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন শুরু হয়। এরপর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবেশ সচেতনতা এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এই খাত ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রচলিত পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ওপর করের চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনক্ষমতার আমদানিকৃত গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রেও কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির করভার ৯৩ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ হবে। ২ হাজার সিসি পর্যন্ত মডেলের ক্ষেত্রে করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশে নামবে।
শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও নীতির কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সম্পূর্ণ তৈরি বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে অতিরিক্ত সুবিধা দিলে দেশীয় উৎপাদন খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
একাধিক উদ্যোক্তার মতে, সম্পূর্ণ তৈরি বৈদ্যুতিক ট্রাক শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয়ভাবে বডি নির্মাণ ও সংযোজন শিল্প প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হবে না। অথচ দেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করেছে এবং সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
তাদের ভাষ্য, বাজেটে বাণিজ্যিক আমদানির তুলনায় উৎপাদন ও শিল্পায়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
অন্যদিকে দেশেই বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজেট প্রস্তাবকে খাতটির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, কর ছাড়ের ফলে ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী হবে এবং দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
তবে উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের কিছু বড় উৎপাদক অত্যন্ত কম দামে বৈদ্যুতিক যান রপ্তানি করতে সক্ষম। ফলে পর্যাপ্ত নীতিগত সুরক্ষা ছাড়া দেশীয় উৎপাদকদের জন্য বাজারে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
এদিকে পুনঃশর্তাধীন গাড়ি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বৈদ্যুতিক গাড়িতে কর কমানো এবং মধ্যম আকারের পেট্রোল-ডিজেলচালিত গাড়িতে কর বাড়ানোর ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এতে প্রচলিত গাড়ির বাজার এবং পুনঃশর্তাধীন গাড়ি খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের মোটরযান খাতের সার্ভিসিং, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও দক্ষ জনবল কাঠামো এখনো মূলত প্রচলিত ও হাইব্রিড যানবাহনকেন্দ্রিক। ফলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দ্রুত বিস্তার ঘটাতে হলে চার্জিং অবকাঠামো, কারিগরি দক্ষতা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত। তবে এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু আমদানি উৎসাহিত করলেই হবে না; একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

