বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিকে নতুন প্রবৃদ্ধির খাতে পরিণত করতে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদার করেছে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। সম্ভাবনাময় চারটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ, নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সমন্বিত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সামুদ্রিক সম্পদ দেশের রপ্তানি আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীন মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, মৎস্য বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।
সেমিনারে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির চারটি খাতকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ, সামুদ্রিক চাষাবাদ, মৎস্য ও চিংড়ি উৎপাদন এবং সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে এসব খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও এখনো বাণিজ্যিক পরিসরে এর পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি।
আলোচনায় গভীর সমুদ্রে আধুনিক মাছ ধরার নৌবহর গড়ে তোলা, অফশোর কার্যক্রম সম্প্রসারণ, মাছ অবতরণ কেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, বাণিজ্যিক সামুদ্রিক চাষাবাদ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিংড়ির মূল্যশৃঙ্খল, কোল্ড চেইন অবকাঠামো এবং আধুনিক সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়।
মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
তিনি জানান, সেমিনারের পর সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসা নীতিগত, অবকাঠামোগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তার ভাষ্য, সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাময় ধারণাগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য বিনিয়োগ প্রকল্পে রূপান্তর করা। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশিক চৌধুরী আরও বলেন, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু দেশীয় চাহিদা পূরণ নয়, বরং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য মৎস্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করা। নতুন নেতৃত্ব বিনিয়োগকারীদের সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে আন্তরিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি মাতারবাড়ী ও মহেশখালীকে ভবিষ্যতের সামুদ্রিক শিল্প উন্নয়নের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই দুটি অঞ্চলকে ঘিরে সমন্বিত অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা গড়ে তোলা গেলে বড় ধরনের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।
সেমিনারের ধারাবাহিকতায় মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ সহায়তা ডেস্কের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক বিষয়ক ইউনিটের সাবেক সচিব এবং অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে। তবে টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই আয় দ্বিগুণ বা এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি মনে করেন, বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং সামুদ্রিক খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের নতুন উৎস সৃষ্টি হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে জাপানের দূতাবাসের উপপ্রধান ও মন্ত্রী তাকাহাশি নাওকি বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে। এই চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশেষ করে খাদ্য ও মৎস্য খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
তার মতে, বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি শুধু ঐতিহ্যগত শক্তির জায়গাই নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল, সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার ওপর অধিকার থাকা সত্ত্বেও এখনো সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মাছ আহরণ নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, রপ্তানি, কোল্ড চেইন, সামুদ্রিক চাষাবাদ এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তবে এর জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

