নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চোরাই ভারতীয় প্রসাধনী জব্দের ঘটনাকে ঘিরে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে ঘুস বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অডিওতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে কথিত চোরাকারবারির সঙ্গে টাকার অঙ্ক নিয়ে দর কষাকষি করতে শোনা গেছে বলে দাবি উঠেছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে থানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।
পুলিশ সূত্র ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় একটি পিকআপভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ করা হয়। উদ্ধার করা পণ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বডি স্প্রে, শ্যাম্পু ও অলিভ অয়েল ছিল। অভিযানের সময় গাড়ির চালক ও তার সহকারীকে আটক করা হয়।
পরে এ ঘটনায় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার প্রধান অভিযুক্ত স্থানীয় এক ব্যক্তি, যাকে চোরাই পণ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযানের পরপরই নতুন মোড় নেয় পুরো ঘটনা। বুধবার রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে দুটি কথোপকথনের অডিও। দাবি করা হচ্ছে, সেখানে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং মামলার এক আসামির মধ্যে আর্থিক সমঝোতার আলোচনা হয়েছে।
প্রথম অডিওতে শোনা যায়, এক ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তাকে মামলা থেকে রেহাই দিতে অনুরোধ করছেন। বিনিময়ে তিনি ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং কম মালামাল জব্দ দেখানোর কথাও বলেন। জবাবে অপর ব্যক্তি আরও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন বলে অডিওতে শোনা যায়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিন লাখ টাকা দাবি করার বিষয়টিও উঠে আসে।
আরেকটি অডিওতে কথিত পুলিশ কর্মকর্তাকে দ্রুত টাকা আনার জন্য চাপ দিতে শোনা যায়। সেখানে তিনি আড়াই লাখ টাকার নিচে সমঝোতা হবে না বলে উল্লেখ করেন বলে দাবি করা হচ্ছে। জবাবে অপর ব্যক্তি দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেন এবং কিছু সময় চান। একই অডিওতে হোয়াটসঅ্যাপের কল রেকর্ড না করার বিষয়েও সতর্ক করতে শোনা যায়।
অডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুলিশি দুর্নীতি ও সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধে অভিযানের চেয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বেশি সামনে আসছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অডিও সামনে আসার পর অভিযুক্ত এসআইকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, পুরো বিষয়টি জেলা পুলিশ তদারকি করছে। একই সঙ্গে মামলার প্রধান অভিযুক্তকে আটকের চেষ্টা চলছে। তবে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
ঘটনাটি নতুন করে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বিভাগীয় তদন্ত নয়, প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের মাধ্যমে অডিওগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।

