রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সোমা আক্তার (ছদ্মনাম), হঠাৎ করেই দেখেন তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে আইডি খোলা হয়েছে। যেখানে এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন অশ্লীল ছবি পোস্ট করে খারাপ ক্যাপশন দেওয়া হচ্ছে।
পোস্টগুলোতে দ্রুত লাইক ও কমেন্ট বাড়তে থাকে কিন্তু এর চেয়ে বেশি বাড়তে থাকে সোমার দুশ্চিন্তা। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে তিনি সাইবার পুলিশের দ্বারস্থ হন। তদন্তে জানা যায়, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে তারই এক খালাতো ভাই, যিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার পরিকল্পনা করেন।
এমনই আরেক ঘটনা রাজধানীর শনিরআখড়া এলাকার বৃষ্টি খানম (ছদ্মনাম)-এর। ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে আরিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে দেখা করার সময় কৌশলে তার ফেসবুক আইডির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় আরিফ। এরপর এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবি পোস্ট করে শুরু করে ব্ল্যাকমেইল। ধীরে ধীরে বৃষ্টির কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় সে।
শুধু সোমা বা বৃষ্টি নন, সারা দেশে এ ধরনের সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বজন, সহপাঠী বা প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে প্রতারণার মাধ্যমে এসব ঘটনা ঘটছে। এআই জেনারেটেড ছবি এখন সাইবার বুলিংয়ের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
সাইবার অপরাধ শুধু বুলিংয়েই সীমাবদ্ধ নেই। ফিশিং লিংকের মাধ্যমে আইডি হ্যাক, ওটিপি ফাঁদে অর্থ চুরি, জিমেইল হ্যাক, অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণা, পণ্য বিক্রির নামে টাকা আত্মসাৎ—সবই এখন নিয়মিত ঘটনা। ডিএমপির ডিবি সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ নভেম্বর থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে মোট ৯০৫টি সাইবার জিডি জমা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সাইবার বুলিং: ১৩০টি
- টেলিগ্রাম প্রতারণা: ২৩৭টি
- ফেসবুক প্রতারণা: ১৫০টি
- বিকাশ প্রতারণা: ২২০টি
- ফেসবুক ও জিমেইল হ্যাক: ৯৮টি
- হারানো আইডি উদ্ধার: ৭০টি
এ সময়ে দুটি মোবাইল ফোন, ১৫টি ফেসবুক আইডি ও ৭টি জিমেইল আইডি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৭৩ জনকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং ২৯০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
ডিবি সূত্র জানায়, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমোসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হ্যাকিং ও প্রতারণা বেড়েছে। অনলাইন লেনদেন বৃদ্ধির কারণে অপরাধীরাও নতুন কৌশলে সক্রিয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠন করা হয়েছে ‘রিকভারি রেঞ্জার টিম’। একজন এডিসির নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের এই টিম কাজ করছে।
ডিবির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের ডিসি মো. শাহরিয়ার আলম জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সাইবার সহায়তার জন্য হটলাইন চালু রয়েছে (০১৩২০২০২০২০)।
ঢাকার আইনজীবী রুহুল আমিন একটি লিংকে ক্লিক করার পর তার ফেসবুক আইডি ও ফোন হ্যাক হয়ে যায়। পরে সাইবার পুলিশের সহায়তায় তিনি আইডি ফিরে পান।অন্যদিকে সরকারি কর্মচারী তাসলিমা বেগম ফোন হারানোর পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ হারান। পরে সাইবার পুলিশের সহায়তায় আইডি ও মোবাইল—দুটিই উদ্ধার করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে এই ধরনের সেবা এখনও সীমিত।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ জানান, টু-ফ্যাক্টর বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা উচিত।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও দ্রুত বাড়ছে। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে এই অপরাধে। বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রযুক্তিগত সচেতনতা এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা ব্যবস্থা।

