বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান ভোগ্যপণ্য (FMCG) বাজারে নতুন করে প্রবেশ করেছে জাপানের সুপরিচিত কোম্পানি লায়ন কর্পোরেশন। দীর্ঘ ১৩০ বছরের বেশি ইতিহাসের এই প্রতিষ্ঠান এবার সরাসরি বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করে নিজেদের উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। প্রায় ১৮ কোটির ভোক্তার এই বাজারকে সামনে রেখে তাদের এই পদক্ষেপকে অনেকেই কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
লায়ন কর্পোরেশন প্রথম বাংলাদেশে প্রবেশ করে ২০২২ সালে, স্থানীয় কল্লোল গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘লায়ন কল্লোল লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই যৌথ প্রতিষ্ঠানে জাপানি কোম্পানিটির অংশীদারিত্ব ৭৫ শতাংশ, যা থেকে বোঝা যায় তারা এই বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মাস থেকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে (জাপানিজ ইকোনমিক জোন নামে পরিচিত) তাদের কারখানায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রায় ৩.৩ হেক্টর জমির ওপর নির্মিত এই কারখানাটি আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো স্থাপনাটি নির্মাণ করেছে জাপানের শিমিজু কর্পোরেশন, যা বিশ্বজুড়ে শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে সুপরিচিত।
কারখানাটি চালু হওয়ার পর প্রথম ধাপে দুটি পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে—‘মামা লেমন’ ডিশওয়াশিং লিকুইড এবং ‘সিস্টেমা’ টুথব্রাশ। তবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে আরও গৃহস্থালি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য এই কারখানায় উৎপাদন করা হবে। প্রবেশদ্বারে প্রদর্শিত পণ্যের তালিকায় ইতোমধ্যে ‘কোডোমো’ বেবি কেয়ার, ‘জেট’ ফ্যাব্রিক ক্লিনিং এবং বিভিন্ন ওরাল কেয়ার পণ্য দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
কোম্পানির চেয়ারম্যান গো ইচিটানি এই বিনিয়োগকে বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভোক্তাদের জন্য আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী পণ্য নিশ্চিত করা যাবে। পাশাপাশি এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা গঠনে ভূমিকা রাখবে।
কল্লোল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফাও এই অংশীদারিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, জাপানি প্রযুক্তি ও উৎপাদন মানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের গুণগত মান আরও উন্নত হবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক।
কারখানার কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ক পরিচালক তাকাশি ওচিয়াই জানিয়েছেন, এই স্থাপনাটি গড়ে তোলার সময় গুণগত মান, দক্ষ জনবল এবং উৎপাদন শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এখান থেকে রপ্তানির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
বর্তমানে এই কারখানায় প্রায় ২৭৩ জন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে প্রায় ৭.৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা পরবর্তী ধাপে বাড়িয়ে প্রায় ১৯.৪১ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই বিনিয়োগকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী মনে করেন, এ ধরনের বড় বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বাড়ায় এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিহারু তাগাওয়া জানান, বর্তমানে এই জোনে তিনটি কোম্পানি উৎপাদনে রয়েছে, যার একটি লায়ন কল্লোল। ইতোমধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান জমি লিজ নিয়েছে এবং বেশ কয়েকটি নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। নির্বাচনের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তিনি জানান।
বিশ্বজুড়ে লায়ন কর্পোরেশন তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে। ২০২৫ অর্থবছরে তাদের সম্মিলিত বিক্রয় আয় ৪০০ বিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ২.৫২ বিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী ৮ হাজারের বেশি কর্মী এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে লায়নের এই বিনিয়োগ শুধু একটি নতুন কারখানা চালু হওয়া নয়; এটি দেশের উৎপাদন খাত, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশকে কেবল একটি বাজার হিসেবেই নয়, বরং উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করছে।

