ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, দেশের অর্থনীতি একসঙ্গে কয়েকটি বড় বাহ্যিক ধাক্কার মুখোমুখি, যা ভবিষ্যতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সম্প্রতি ঢাকায় পিআরআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক উপস্থাপনায় সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান জানান, বর্তমানে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, এসব বৈশ্বিক ধাক্কা সরাসরি জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য প্রবাহ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। ফলে পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে, কারণ দেশের প্রায় ৩১ শতাংশ জ্বালানি আমদানি এই অঞ্চল থেকে আসে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের (জেডসিএ) তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, যদি জ্বালানির দামে বড় ধরনের ধাক্কা আসে, তাহলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি বিল ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ১৬ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পেমেন্ট ব্যালান্স বা বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের ওপরও চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে নীতিগতভাবে সরকার যে সীমিত পরিসরে কাজ করতে পারছে, সেটিও অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছে পিআরআই।
তবে পুরো চিত্রটাই যে নেতিবাচক, তা নয়। গত প্রায় ১৮ মাসে—২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত—বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসে এবং ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধিও গত পাঁচ মাস ধরে দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছায়। এসব সূচক কিছুটা আস্থার ইঙ্গিত দিলেও এর ভিত্তি ছিল দুর্বল।
পিআরআই বলছে, এই পুনরুদ্ধারের পেছনে মূল দুর্বলতাগুলো এখনো রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ শতাংশে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম। ব্যাংক খাতেও বড় ধরনের চাপ রয়েছে—খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে পড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে।
এর পাশাপাশি সরকারের আর্থিক পরিসর বা ফিসকাল স্পেসও প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে সরকারকে উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের দিকেও ঝুঁকতে হচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে আশিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব ও আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে। বরং এমন অনিশ্চিত সময়ে সংস্কার আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তার ভাষায়, এটি অনেকটাই “নিজের তৈরি সমস্যা”, যা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
পিআরআইয়ের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন অত্যন্ত সতর্ক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হয়তো রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা—এই দুইয়ের চাপ সামলে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কঠোর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই।

