মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় দুই মাস আগে শুরু হওয়া যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এখন বাংলাদেশের ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা, যার প্রভাব পড়ছে বড় শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপরও।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের লজিস্টিকস ব্যবস্থায়ও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চার হাজারের বেশি ট্রাকের বহরের মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বর্তমানে ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে সারা দেশে ডিলারদের কাছে কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পৌঁছানোর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু পরিবহনই নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থির হয়ে উঠেছে। এর ফলে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, খরচ বাড়ছে এবং নগদ অর্থ প্রবাহও সংকুচিত হচ্ছে—যা ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় চাপ তৈরি করছে। আকিজবশির গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্য পরিবহন এখন প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ১৫ শতাংশ বাড়তি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, সমুদ্রপথে বাণিজ্যে ইতোমধ্যে ভাড়া তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ায় দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনা অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
শুধু বাইরের পরিবহন নয়, নিজস্ব লজিস্টিকস সুবিধা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও তাদের বিশাল ট্রাক বহর থাকা সত্ত্বেও একই সমস্যার মুখোমুখি। প্রাণ-আরএফএলের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, জ্বালানি সংকট সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি উৎপাদনেও বড় প্রভাব ফেলছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানায় ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদিত পণ্য অনেক সময় কারখানার গেটেই পড়ে থাকছে। জ্বালানির সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি ছোট যানবাহনের পরিবর্তে বড় ট্রাকে বেশি পণ্য পরিবহনের দিকে ঝুঁকছে। ফলে আগের মতো সরাসরি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বজুড়ে চাপা সংকট:
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০৫ থেকে ১০৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটি এখন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পট মার্কেট থেকে ক্রয় এবং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
শুরুতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নতুন দামে সমন্বয় করতে হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা। নতুন এই সমন্বয়ের ফলে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, অকটেনের ২০ টাকা এবং পেট্রোলের ১৯ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে খরচ বৃদ্ধির চাপ আরও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে ইতোমধ্যে উচ্চ ব্যয়ে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নতুন করে চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
দেশের উৎপাদন খাতে এখন একাধিক চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তবে বাজারে চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি ব্যয় সরাসরি ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারছে না। ফলে পুরো উৎপাদন চক্রেই তৈরি হয়েছে চাপ ও ভারসাম্যহীনতা।
সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স) মাসুদুর রহমান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাবে তাদের গ্রুপের কাগজ ও সিমেন্ট ব্যবসা এখন চাপের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি ৮ ডলার থেকে বেড়ে ১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ডিজেল সংকটের কারণে কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাসুদুর রহমান আরও জানান, ডিজেল সংকটের কারণে তাদের পণ্য সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ২০ কোটি টাকার পণ্য বাজারে সরবরাহ হতো, এখন তা ১০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।
অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেলেও বাজার পরিস্থিতি ও ভোক্তার চাপ বিবেচনায় কোম্পানিগুলো পণ্যের দাম বাড়াতে পারছে না। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার হার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাহিদার মন্দাভাব। অনেক ক্ষেত্রে টিস্যু ও টয়লেট্রিজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্যের ব্যবহারও কমে এসেছে। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ প্রবাহ আরও কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

